বাম-ডানের বাইরে রুহানী সম্ভাবনা ও মুক্তির মুর্শিদ সন্ধানী ফররুখ

০৯ জুন,২০১৩

আনন্দ মজুমদার

কবিকে চিনতে হয় জীবন ও কাব্য একসাথে মিলিয়ে মিশিয়ে এবং ইতিহাস, পরিবেশ ও পরিস্থিতির আলোকে। ফররুখ আহমদ সে-ই কবি যাকে না চিনলে বাংলা কাব্যের রাত পোহাবে না; যার মুহুর্তের কবিতা (সনেট), গল্প ও গদ্যসম্ভারও আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। ফররুখ আজীবন সংগ্রামী, বাঙ্গালীর প্রগতিশীলতার শহীদ। বামপন্থার গিলোটিনে যে সব কবির শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে, ফররুখ তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। উপনিবেশিকতা ও নির্দিষ্ট ধরনের ভাবাদর্শের উন্নাসিক উৎকাল্পনিক মতাদর্শের মিশেলে গড়ে ওঠা প্রগতিশীলতার বলী তিনি। লড়াই করেছেন নিজের মতো করে।

ছাত্রজীবনে বামপন্থায় তালিম নিলেও বেশীদিন সেই সব আপ্তবাক্য তিনি তামিল করেন নাই। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। সেই সময়কার ইতিহাস ও রাজনৈতিক সংগ্রামের এক অনবদ্য দলিল ফররুখের কবিতা। দাঙ্গা, মন্বন্তর, মানুষের দুর্দশা ও মুক্তির সম্ভাবনা তাঁর কবিতার উপজীব্য। ইতিহাস তাঁর কবিতার অঙ্গ ও আখ্যানভাগ। 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে'র সপ্তম অধিবেশনে 'বিদায়’ ও 'দল-বাঁধা বুলবুলি' স্বকন্ঠে আবৃত্তি করেন। এই সময়টাতেই ১৩৫০ সালের মন্বন্তর নিয়ে তিনি অনেকগুলো কবিতা রচনা করেন। দাঙ্গা ও মন্বন্তর নিয়ে নজরুল কবিতা লিখার সময় পান নি। ফররুখ সেই চৈতন্যের সর্বোচ্চ বিকশিত রূপ। ‘নিজের রক্ত’ কবিতাটি দাঙ্গা বিরোধী গুচ্ছকবিতারই একটি; কোলকাতা বেতারে তিনি এই কবিতাটি পাঠ করেন।

তাঁর কাছে রক্তই একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ। সকল রক্তই তাঁর রক্ত। তাঁর ‘লাশ’ শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ কবিতাটি সুকান্ত সংকলিত ‘আকাল’ কবিতাপত্রে অন্তর্ভূক্ত হয়। ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়েই রচিত হয় 'সাত সাগরের মাঝি', 'সিরাজাম মুনীরা', 'কাফেলা' কাব্যের কবিতাগুলো। কবি হিসাবেই ইতোমধ্যেই তিনি স্বীকৃত। ১৯৪৪ 'সাত সাগরের মাঝি' প্রকাশিত হয়। ছয় বছর পর ১৯৫০ সালে ‘সিরাজাম মুনীরা’ প্রকাশিত হয়।

যে কবি আল্লামা ইকবালের মৃত্যুর পর তাঁকে নিবেদিত কবিতা 'স্মরণী’ রচনা করেন সেই কবি ১৯৪৯ সালে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত ইকবাল-জয়ন্তী অনুষ্ঠানে তরুণ লেখকদের আমন্ত্রণ না করার প্রতিবাদে বর্জন করেন। যে কবি ১৯৪৬ 'আজাদ করো পাকিস্তান' পুস্তিকা প্রকাশ করেন, তিনিই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ‘গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে পর্যন্ত যাঁরা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীর সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি’। (পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য নিবন্ধ, মাসিক সওগাত, আশ্বিন ১৩৫৪, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪৭ সংখ্যা)

কবি ফররুখ আহমদের মূল্যায়ন করা বাংলাদেশের কবিদের জন্য ফরজ কাজ। তাঁর সময়কালের (জুন ১০, ১৯১৮ - অক্টোবর ১৯, ১৯৭৪) সত্যের সারাৎসারই তাঁর কাব্য। কাব্য মাত্রই বাকপ্রতিমা। তাঁর বাকপ্রতিমায় মুক্তি ও মুর্শিদের মহামিলন ঘটেছিলো। সেইকালে স্বাভাবিক প্রগতিশীলতা ছিল বামপন্থা। স্বদেশী আন্দোলনের র্যা ডিকেল ধারাও প্রগতিশীল বলে গণ্য হত। কবিতা ছাত্রজীবনে রচিত তাঁর কবিতা রোমাণ্টিসিজমের শক্তিশালী উচ্ছ্বাস-উদ্বেলতায় আন্দোলিত। ছান্দসিকতার চিরায়ত ধ্রুপদ ধারার অনুরণন। এই রকম মত অনেকেই পোষণ করেছেন।

রোমাণ্টিজমের দার্শনিক দিক সম্পর্কে সচেতন না থেকেই আমরা হরহামেশা শব্দটি ব্যবহার করি। ঘোরতরভাবে যারা পশ্চিমী নান্দনিক ঘরাণার তারা তাঁর কবিতার অভিযাত্রাকে রোমাণ্টিসজম থেকে আধুনিকতার দিকে বলে চিহ্নিত করেছেন। অধুনিক কবিতা বলার আগে কবির দাশনিক ও ভাবপরিমণ্ডলের তত্ত্ব তালাশ করা দরকার। নইলে সাহিত্যের পর্যালোচনার অপরিসীম রাজনৈতিক তাৎপর্য আমরা ধরতে পারব না।

ফররুখ আহমদ সেই মানুষ এই ঘোর কলিকালের অবিমৃষ্যকারিতা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার মধ্যে, সর্বগ্রাসী বাছবিচার ও পর্যালোচনার দারিদ্র্যের ত্রাহি ত্রাহি দশায় যার মনোভূমে উঁকি দিয়ে দেখলে বিরাজিত দশার কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। তাঁকে বোঝার আগে মনে রাখা দরকার আধুনিকতাবাদ ও রোমাণ্টিকতাবাদ দুটোই পশ্চিমে গড়ে উঠা সাংস্কৃতিক, সাহিত্য-শিল্প আন্দোলন। এনলাইটমেণ্টের চিন্তাজগতের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া আকারে এই একই ধারার দুই আন্দোলন ইতিহাসের দুই কালান্তর-ক্রান্তিকালে গড়ে উঠেছিলো। দুইটি আন্দোলনই গভীরভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত।

আধুনিকতাবাদের উপর রোমাণ্টিসিজমের প্রভূত প্রভাব ছিলো। কিছু সূক্ষ্ম-সুগভীর ফারাক এই দুই আন্দোলনকে বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মাত্রাগত ভিন্নতা দান করে। প্রথাগত শিল্প সাহিত্য, ধর্ম ও ভাবধারার বিরুদ্ধে ঊনিশ ও বিশ শতকের শেষ দিকে এই আন্দোলন গড়ে উঠে। পশ্চিমা বিশ্বে তখন ব্যাপক রূপান্তর চলছে। এই ভাঙচুর ও বিচূর্ণীভবনের মধ্যে রিয়েলিজমের ভাবাদর্শকে প্রত্যাখ্যান করার প্রণোদনা সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিণ্ডলে অনুভূত ও স্পন্দিত হচ্ছিল। রোমাণ্টিসিজম শিল্প বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া প্রসূত। এটি রিজন বা যুক্তি যে আবেগকে অগ্রাহ্য করে তার বিরুদ্ধে। এতে আবেগের উপর রিজনের ঠাঁই নাই। এই আন্দোলনের সারকথা হলো সমাজের ঊর্ধ্বে মানুষ নয়।

‘বুর্জোয়া মানুষকে’ অস্বীকার করছে এই আন্দোলন। রোমাণ্টিসিজমের ভাষ্য হচ্ছে মানুষ স্বগুণে সমুজ্জ্বল, মানুষ হয়ে আগমন স্রষ্টার এক অপার দান, জীব জীবনের মাহাত্ম্য স্রষ্টার এক অনন্য সাধারণ উপহার। মানুষ মূলত একা। মানুষ সমাজ বিচ্ছিন্ন নয়; তবে মানুষ স্বপ্রণোদিত; আপন গুণে বিভূষিত এই মানুষ আপন প্রেরণায় উজ্জীবিত। আধুনিকতাবাদ, অপরপক্ষে, মানুষকে ইচ্ছাশূন্য ভাবে; ইচ্ছানিরপেক্ষভাবেই যেন বা মানুষ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কার্য-কারণ দ্বারা পরিচালিত। মানুষকে করণের নিয়ন্তা হিসাবে আধুনিকতাবাদ দেখে না। রোমাণ্টিসিজম মনে করে মানুষের আত্মা বোবা, সবাক নয়; বেয়াড়া চৈতন্য বসত করে প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যে। এই উচ্ছ্বাস –উদ্বেলতাকে কিছুতেই পোষ মানানো যায় না। নির্বাক মানবাত্মা ও উচ্ছ্বাস উদগীরণশীল চৈতন্যের বসতবাড়ি ব্যক্তির মনোভূমি। আত্মার ভূমিকা নাই আত্মলোকে। কিন্তু আধুনিকতাবাদীরা আত্মার এই রোমাণ্টিক ধারণার সংস্কার সাধন করেন। তাঁরা মনে করেন, আত্মা হলো অনেকগুলো জটিল কাঠামোর বিশাল সমাহার; এক সমগ্র অবিচ্ছেদ্য স্বরূপে বিরাজমান। মানুষের এর উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। আত্মা মানুষকে পরিচালিত করে।

রোমাণ্টিসিজম বিষয়ী বা ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে সবিশেষ মূল্য দিয়ে থাকে। ব্যাক্তির একান্ত অভিজ্ঞতা ও নান্দনিক অভিপ্রকাশের সচেতন ক্ষমতার উপর জোড় দেয়। আধুনিক লেখকগণ মনে করে, ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব অনুভূতি ও আবেগের নান্দনিক অভিপ্রকাশ নয়, বরং ব্যক্তি চৈতন্য ব্যক্তির বাইরের বস্তুজগত ঘিরে আবর্তিত হয়; ব্যক্তির ক্ষমতা রয়েছে চারপাশকে বদলে দেবার, রূপান্তর ঘটানোর ও তার সৃজন সম্ভাবনা চারপাশের বস্তুজগতে আরোপ করার। রোমাণ্টিক লেখকগণ ব্যক্তির মধ্যে জাত অভিজ্ঞতাকে বাইরের জগত থেকে আলাদা করেন এমনটি নয়। কিন্তু ব্যক্তির মধ্যে প্রতিফলিত মনোভূমের বাইরে এসে দাঁড়াতে চান না। তাঁদের মতে, ব্যাক্তি ও বাইরের জগতের সম্পর্ক নিশ্চয়ই আছে এবং বাহির নামক যেই পরিমণ্ডল সে-ই পরিমণ্ডলের মধ্যে দিয়েই অভিজ্ঞতাসঞ্জাত ব্যক্তি ভাব আবেগ নিজের মধ্যে রূপায়িত করে। আধুনিকতাবাদ বলে যে, বাইরের জগতকে বদলে দেয়ার সক্ষমতা ব্যক্তির রয়েছে। রোমাণ্টিসিজম শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়ে উদ্ভুত সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দ্রোহ। আবেগ ও অনুভবের পরিমণ্ডলকে রিজনের উপর ঠাঁই দিতে নারাজ। প্রকৃতিকে যুক্তিবুদ্ধির অধীনস্থ করে রূপান্তরের বিপক্ষে, র্যা শনালিজমের বিরুদ্ধে। বাস্তববাদ বা রিয়্যালিজমের সংকীর্ণ ভাবধারার বিরুদ্ধে আধুনিকতাবাদ। এনলাইটমেন্টের গর্ভজাত নীতি-নৈতিকতা মূল্যবধের ঘোরতর বিরোধী আধুনিকতাবাদ।

অতএব, এই নিরিখে ফররুখ মোটেই আধুনিক কিংবা রোমাণ্টিক কবি নন। তিনিই প্রথম বাংলা সাহিত্যে রোমাণ্টিসিজম ও আধুনিকতার সংকীর্ণ গণ্ডি অতিক্রম করেছিলেন। ভাষার ক্ষেত্রে তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও নজরুলের অনুসারী; রোমাণ্টিক কবি হিসাবে ওয়ার্ডসওয়ার্থ জবানের ভাষা ব্যবহার করতেন। আরবী ফার্সীর অনাবশ্যক ব্যবহার করেননি। তাঁর কবিতায় আছে কালের ডাকের ঝংকার।

রাজনৈতিক চৈতন্যের দিক থেকে ইতিহাসের চিরায়ত যৌক্তিক পক্ষাবলম্বন ও ধারাবাহিকতার বাইরে তাঁর জীবন পরিক্রমায় কোন বিশাল ব্যতিক্রম নেই। আর দশজনের মতোই ছাত্রাবস্থায় বামপন্থী আন্দোনে সক্রিয় হয়ে উঠেন। প্রসঙ্গত তথ্য আকারে বলে রাখি, ১৯৩৭ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৯ সালে রিপন কলেজ থেকে আই এ পাস করেন। কোন কোন সূত্রমতে কলকাতা মডেল এম.ই. স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন। স্কুল-জীবনে শিক্ষক হিসাবে কবি গোলাম মোস্তফা, কথা-সাহিত্যিক আবুল ফজল, কবি আবুল হাশিম প্রমুখ তাঁর জীবনের উপর গভীর ছাপ ফেলেছিলেন। প্রসঙ্গত: সেই সময় মুসলামদের রচিত সাহিত্যকে মুসলিম সাহিত্য বলে অভিহিত করা হতো।

রিপন কলেজে পড়ার সময় বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ শিক্ষকের সান্নিধ্য পান। কবি আহসান হাবীব, কথাশিল্পী আবু রুশদ, কবি আবুল হোসেন, কবি সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন তাঁর সাহিত্য চক্রের এক এক জন নক্ষত্র। তাঁদের সাথে গভীর সম্পর্ক, সখ্যতা ও হৃদ্যতা ছিলো। রিপন কলেজেই পড়ার সময়ই বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় গুচ্ছ কবিতা। এভাবে আধুনিক কবিতার জগতে ফররুখের কবিতার অধিষ্ঠান, যে কবিতা আধুনিকতাকে ফালা ফালা করে কেটেছে। স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। অন্য সূত্রমতে, ১৯৪০ স্কটিশ চার্চ কলেজ ছেড়ে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বি.এ. ক্লাসে কলকাতা সিটি কলেজে ভর্তি হন। এই সময়কালে 'কাব্যে কোরআন' শিরোনামে 'মোহাম্মদী' ও 'সওগাতে' বেশ কিছু সূরার অনুবাদ তাঁর ভাবজগতে কোরান ও কাব্যের সম্পর্ক দার্শনিক উপলব্ধি সম্পর্কে আমাদেরকে সজাগ করে তোলে। সম্ভবত স্কটিশে পড়ার সময়কালেই অর্থাৎ চল্লিশের দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোতে সর্বভারতীয় বা মহাভারতীয় প্রলেতারীয় বিপ্লবের মোহ ত্যাগ করে পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন।

সকল কবিরই প্রথম কবিতার তালাশ কেউ পায় না। ফররুখের প্রথম কবিতাটিও আর সব মহান কবির মতো তিনি ও তাঁর মুর্শিদই পাঠ করেছেন। তবে তাঁর প্রথম কবিতাটি ছাপা হয় ১৯৩৬ সালে খুলনা জেলা স্কুল ম্যাগাজিনে। স্কুলের শিক্ষক কবি আবুল হাশেম এই ম্যাগাজিনটির সম্পাদক ছিলেন।
কবিতা লিখা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ঐশী মেধার বিস্ফোরণ নয়। জগতের সাথে মোলাকাতের এক মৌলিক বীক্ষণ কাব্য। ফররুখের জীবনচক্রের সাথে সমসাময়িক ইতিহাস ও কাব্য এক সূত্রে গাঁথা। ইসলাম ও মুসলিমের জন্য জাগরণময় লেখা নিপীড়িত জনগণের জাগ্রত মনীষার বয়ান। সভ্যতার নামে অসভ্যতা চর্চার বিরুদ্ধে তার লিখনী। তাঁর প্রতিটি কবিতাই ক্রমানুসারে পাঠ করলে দেখা যায় দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, কূপুমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে ক্ষুরধার ছন্দময় প্রজ্ঞা ভবিষ্যতকে বর্তমান করে তুলছে। বর্তমানের অসাম্য, জুলুম ও মানুষের ছিদ্দত-লান্নতের বিরুদ্ধে তাঁর শিখরস্পর্শী ধানুকী পয়ার ও সনেট, মাত্রা ও অক্ষরবৃত্তের জাদুকরী পংক্তি। শ্রাবণ ১৩৪৪, ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ হাবীবুল্লাহ (বাহার) সম্পাদিত 'বুলবুল' পত্রিকায় (শ্রাবণ, ১৩৪৪) 'রাত্রি' প্রকাশিত হয়। 'পাপ-জন্ম' কবিতাটি প্রকাশিত হয় 'মোহাম্মদী' পত্রিকায় আষাঢ়, ১৩৪৪ সংখ্যায়। রাত্রি ও পাপ-জন্মের নামকরণের তাৎপর্য অপরিসীম। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত মাসিক সাহিত্য পত্র 'সওগাতে' প্রথম কবিতা 'আধাঁরের স্বপ্ন' ছাপা হয় (পৌষ, ১৩৪৪)।

নিপীড়িত মুসলমানদের পলিটিক্যাল স্পেস হিসাবেই পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি দেখতেন। তাঁকে ইসলামী রেঁনেসার কবি বলা হয়, যদিও ইসলামী রেঁনেসা নামক কোনো কিছুই ঘটে নাই। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকারী র্যা শনালিস্ট ও কোঁত সাহেবের পজিটিভিজম (সত্য পরখ করতে হয় বৈজ্ঞানিক জ্ঞান দ্বারা। লজিকবিদ্যা, গাণিতিক লজিক কিংবা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতাই একমাত্র সকল পাক্কা ও মান্য করার মতো জ্ঞানের উৎস। এই নিয়ে বিচারের আগে এটা জানা থাকা ভালো যে, কমিউনিস্টদের মতে পজিটিভিজম হলো বুর্জোয়া দর্শনের সেই ধারা যারা মনে করে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানই সত্যিকারের জ্ঞানের একমাত্র উৎস। এটি দর্শন পাঠের জ্ঞানতাত্ত্বিক মূল্য অস্বীকার করে) বিশ শতকের ‘আলোকিত’ যুক্তিবাদীদের ছায়াতলে ইসলামী রেঁনেসা নামক কোনো ঐতিহাসিক ঘটনাই সংগঠিত হয় নি। পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জাগরণ ঘটেছিলো, ফররুখ সেই জাগরণের কাব্য প্রতিনিধি। তিনি নিপীড়িত মানুষের পক্ষের কবি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা তাঁর লক্ষ্য ছিলো না। নিপীড়িত গুমরাহিতে পরিপূর্ণ মুসলিমদের মুক্তিই তাঁর আকাঙ্খা ছিলো।

ভাষা আন্দোলনের পর পরই ফররুখের প্রতি অবহেলা লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পরও এই কবি বাংলাদেশে চরমভাবে অবহেলিত হন। প্রচার করা হয় যে ফররুখ ডানপন্থার প্রতি সহানুভূতিশীল ও তাঁদের সান্নিধ্য পছন্দ করেন। এটা মোটেও ঠিক কথা নয়। ফররুখ ডান ও বামপন্থার উর্ধ্বে তাঁর মুক্তির মুর্শিদের ইশকেই দুনিয়া বদলে দেবার অবিনাশী সংকল্পে পাঞ্জেরির সাথে সওয়াল-জওয়াব করছিলেন। তিনি তাই রোমাণ্টিকও নন, আধুনিকও নন। তিনি মানুষের রুহানীর বৈপ্লবিক সম্ভাবনার মধ্য দিয়েই এমন এক জাগরণের স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন যা সূফী তন্ময়তায় মিস্টিক নয়, বৈপ্লবিক; ছন্দজাত ঋজুতার বঙ্কিম বিনম্রতার মধ্যেও খরস্রোতা।

কাব্যের প্রকৃষ্ট প্রকরণশৈলী, অনন্যসাধারণ বাগপ্রতিমা, ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর প্রতি সংবেদনশীলতা, বাঙালি মুসলিম সমাজের নাড়ির স্পন্দন স্পর্ধিত ছন্দ তাঁর কবিতাকে করেছে অনন্যসাধারণ। অকাতরে ব্যবহার করেছেন আরবী-ফার্সি শব্দ। নজরুলের মতোই তাঁর কবিতায় সেই সব শব্দ আরব-ফার্সী বাঙলা আকারে আলাদা করে চেনা যায় না। এই চেনানোর ব্যাপারটা শব্দের ব্যূৎপত্তিগত জ্ঞানতাত্ত্বিক পিপাসা মিটানোর বদলে বাঙলা কবিতা বিচারে সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল ধারারই জয়জয়কার ভাবধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলো।

সংস্কৃতি পাতার আরো খবর

মিঠুর একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘ডিকনস্ট্রাকটিং’

সংস্কৃতি প্রতিবেদকআরটিএনএনঢাকা: চিত্রশিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা খালিদ মাহমুদ মিঠুর একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু হয়েছে।& . . . বিস্তারিত

ঢাকা শহর প্রতিষ্ঠার ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শিল্পকর্ম প্রদশর্নী

সংস্কৃতি প্রতিবেদকআরটিএনএনঢাকা: শুরু হয়েছে শিল্পী কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ এর একক শিল্পকর্ম (ইনসাইট) প্রদর্শনি।বাংলাদেশ শিল . . . বিস্তারিত

ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: ০১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: [email protected]