মাসুদ আখন্দের ‘স্লেভ কুইন’

০৭ জুন,২০১৩

ওয়াহিদ সুজন
আরটিএনএন

দৌলতদিয়া চিনেন তো! সেখানে ফেরি ঘাট আছে, আছে পতিতাপল্লী। এবার তো চেনা গেল। একটা প্রশ্ন করি,গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে দৌলতদিয়ার দুরত্ব কত? আন্দাজে বলা যায় এই দুরত্ব বিশাল কিছু নয়। কিন্তু কাপাসিয়ার একজন বালিকা যখন মিরপুর মাজার হয়ে দৌলতদিয়ায় আসে তাতে পাল্টে যায় তার নাম-সাকিন। আমরা যার কথা বলছি তার পারিবারিক নাম রাণী। কাপাসিয়ার রাণী দৌলতদিয়া পতিতাপল্লীতে হয়ে যায় সুমি। বয়সও বেড়ে যায়। এখানেই সব নয়,একদিন সুমি রাণী নাম নিয়ে আবার কাপাসিয়ায় ফিরে আসে। নামটা হয়তো ফেরত পায় কিন্তু ততদিনে বদলে গেছে পরিচিত কাপাসিয়া ও পরিচিত মানুষেররা। দাস জীবন ছেড়ে আসা সুমিকে কেউ চায় না।

ইন্টারনেট ঘেটে যা জানা গেল,‘স্লেভ কুইন’ ছবিতে আমেরিকান, সুইডিশ, ভারতীয় ও বাংলাদেশি শিল্পীরা অভিনয় করবেন। ছবিটির শুটিং করা হবে বাংলাদেশ ও সুইডেনে। এ ছবির ভাষা হবে ইংরেজি, তবে বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য ছবিটি বাংলায় ডাবিং করা হবে। ‘স্লেভ কুইন’ ছবিটি প্রযোজনার দায়িত্বে রয়েছে আমেরিকান ও সুইডিশ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান।

এটি মে মাসের খবর।

খবরটি মাসুদ আখন্দের স্লেভ কুইন সম্পর্কেই বলা হচ্ছে। এটা একটা সুখবর হতেই পারে। তবে এখানে বাংলাদেশ ও সুইডেনে শুটিং করা কোন পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্রের কথা আমরা বলছি না। আমরা বলছি মাসুদ আখন্দ নির্মিত ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘স্লেভ কুইন’ নিয়ে (http://vimeo.com/62512180)।

‘পিতা’খ্যাত চলচ্চিত্রকার মাসুদ আখন্দ তার ডকুমেন্টারি নিয়ে বলছেন, ‘সুইডিশ টেলিভিশনের জন্য ‘দাসশিশু’ বিষয় নিয়ে কাজ করতে যেয়ে এক ভয়াবহ সত্যের সন্মুখীন হই আমি। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও আমার দেশে এমন হতে পারে আমার ধারণার বাইরে ছিল। আমাকে দিয়ে যতটুকু করা সম্ভব হয়েছে আমি করেছি এবং আরো করবো’।

ডকুমেন্টারির মূল চরিত্র সুমি সম্পর্কে জানানো হচ্ছে,‘সুমি ঢাকার কাছাকাছি কাপাসিয়া একদা মা, দুই বোন ও এক ভাইয়ের সাথে থাকত। একদিন মিরপুরের এক মাজারে এক মহিলার সাথে তার দেখা হয়। তার নাম শান্তি। এ হলো তার ব্রথেল মা এবং তার অধীনেই সুমি থাকে। সে সুমিকে চোখের আড়াল হতে দেয় না, যদি সে পালিয়ে যায়। তার পরিবার এই অবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানে না’।

সেই সংবাদচিত্র প্রচারের পরে সুমিকে উদ্ধারের কাহিনি নিয়ে তিনি নির্মাণ করেন বিশ মিনিটের প্রামাণ্য চিত্র ‘স্লেভ কুইন’। আমাদের দেশে যখন সন্ত্রাসীদের আঘাতে অজস্র ক্যামেরার সামনে একজন বিশ্বজিত মারা যায় তখন মাসুদ শুধুমাত্র ঘটনার বর্ণনাকারী হিসেবেই থাকেননি,তিনি হয়ে গেছেন একজন উদ্ধারকারী। এটি অনুসন্ধানী একজন সংবাদকর্মীর বাইরে তার মানবিক রূপান্তরের আখ্যান। যা আমাদের ভাবনায় ফেলে দেয়।

ক্যামেরার কাজে আলাদা কোন বিশেষত্ব নাই। অহেতুক বিষয়কে জটিল করে তোলার চেষ্টাও নাই। এমনকি উদ্ধারপর্বে কোন অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ নাই। খুব সাদামাটা নির্মাণ, কিন্তু বিষয়শৈলীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ল্যাপটপে রাণীকে যখন তার মা দেখে, পতিতাপল্লীতে মা-মেয়ের যখন দেখা হয় এবং শেষ দৃশ্যে রাণীর তাকিয়ে থাকা আমাদের আপ্লুত করে ও ভাবায়।

মাসুদ এই ফিল্মের বিবেক হয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন তুলেন। তার কাছে অনেক প্রশ্ন আছে,যথাযথভাবে উত্তর নাই। এর ভেতর দিয়ে ধরা পড়ে মাসুদ যে সমাজে বেড়ে উঠেছেন তার সংকট। যে সংকটকে আমরা সহজভাবে গ্রহন করেছি। কিন্তু এর বাইরের উত্তরণ- যদি খেয়াল করি তবে তা হয়ত কিছু মানুষকে নির্ভার করত। আমাদের সমাজকেই নির্ভার করত।

মাসুদের বর্ণনায়,দৌলতদিয়া পতিতাপল্লী বাংলাদেশের বড় পতিতাপল্লীগুলোর একটি। এখানে সরকারি হিসেবে যৌনকর্মী আছে প্রায় ষোলশ, আসলে ছয় হাজারের বেশি যৌনকর্মীর বাস। ইউএন-র মতে, প্রতিদিন এশিয়ায় মিলিয়নখানেক শিশু বিক্রি হয়। বাংলাদেশে কি পরিমান শিশু বিক্রি বা পাচার হয় তার সংখ্যা কোন সংস্থার জানা নাই।  

মাসুদ জানান, শিশুরা দৌলতদিয়ার প্রধান আকর্ষণ। শিশুবাণিজ্য এখানে খুব্ই সাধারণ বিষয়। কেন না এদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ও টাকার কোন ভাগ দিতে হয় না। এটাকে বাণিজ্য বলা হলেও শিশুদের কাছে কতটা বাণিজ্য! তিনি জানান, শান্তি সুমির খদ্দের প্রতি দুইশ টাকা নেয় এবং তার কোন অংশই সুমি পায় না।

এরমধ্যে মাসুদ গুরুতর প্রশ্ন তোলেন। কেননা, সমাজের চোখে খুবই নিন্দনীয় এই ব্যবসা নিয়ে আমাদের মধ্যে কোন উচ্চবাচ্য নাই। আমরা জেনেও না জানার ভান করি অথবা আমাদের আছে অশ্লীল কৌতুহল। আবার যারা একে নিয়ে উদ্বিঘ্ন তাদের অবস্থা তো আরো খারাপ। তাদের আছে বিদেশি ফান্ড এনে দীর্ঘস্থায়ী রুজি রোজগারের ধান্ধা।

মাসুদ বলেন,দৌলতদিয়ার এই বাণিজ্যকে ঠেকানো বা ঠেকানোর চেষ্টার কেউ নাই। এমনি কি সরকার বা এনজিও-ও না। কিছু এনজিও এখানকার শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করে। কিন্তু কেউ এই বাণিজ্য বন্ধ নিয়ে কথা বলে না।

একজন সুমি আসলে লাখো সুমির প্রতিনিধি। কিন্তু একজনের উদ্ধার শুধুমাত্র একজনেই সীমাবদ্ধ থাকে। সুমি তার ঘরে ফিসফিস করে মাসুদকে শোনায় তার কাহিনী। সেই কাহিনী থেকে বের হয়ে আসে লাখো সুমির সাকিন ও বঞ্চনা। মাসুদ প্রতিজ্ঞা করে সুমিকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাবে। ফেরত দেবে তার পুরানো নাম রাণী। মাসুদ তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেন। কিভাবে? তা ডকুমেন্টারিটি দেখলেই বুঝতে পারবেন। কিন্তু জানবেন উদ্ধারেই সমাপ্তি নয়। যার গলায় একবার দাসত্বের শেকল পরে সে চাইলেও সহজে মুক্ত হতে পারে না। তাই একরাশ বিষস্নতা দিয়েই ডকুমেন্টারিটি শেষ হলেও মাসুদ আশাবাদী। আশাবাদের জয় হোক।

স্লেভ কুইন
দৈঘ্য: ১৯.৫৯ মি.
প্রযোজনা, পরিচালনা, চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও সংগীত: মাসুদ আখন্দ।
ক্যামেরা: মাসুদ আখন্দ, নিয়াজ মোরশেদ, রোকন উদ্দিন ও থমাস হলস্টন।
রেটিং: ৩.৫/৫

সংস্কৃতি পাতার আরো খবর

নৈতিকতা অর্জনে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা

নিজস্ব প্রতিবেদকআরটিএনএনঢাকা: নতুন প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে ব্যতিক্রমী এক চিত্রাঙ্কন ও আলোকচিত্র প্রতি . . . বিস্তারিত

জাসাসের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদকআরটিএনএনঢাকা: জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের যোগ দিবেন বিএনপি চ . . . বিস্তারিত

ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: ০১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: [email protected]