সাগরতীরে আলোর শহর চট্টগ্রাম

গোলাম মাওলা মুরাদ ২৫ জানুয়ারি,২০১৩
গোলাম মাওলা মুরাদ

সাগর পাহাড় আর নদীর তীরে অপরূপ সুন্দর এক নগরী চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম কেমন- এক বাক্যে প্রকৃতি নিজ হাতে সাজিয়েছে তার প্রিয়তমা এই শহরকে।

প্রাচীন বণিকদের মতো বর্তমানেও বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্যের এক প্রিয়স্থান চট্টগ্রাম। প্রকৃতির অপরূপ রূপের মাঝেই প্রাচীনকাল থেকে সৃষ্ট চট্টগ্রাম বন্দর এ অঞ্চলের গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।

প্রাগৈতিহাসিক সময়ে জিন-পরীদের রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত এই জনপদকে আলোকময় করেছিলেন এক দিশারী। তারপর সে আলো ছড়িয়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে। স্থলে, জলে, সাগরে মহাসাগরে। চেরাগী পাহাড়, পরীর পাহাড় কিংবা জিলাপীর পাহাড়ের স্মৃতিচিহ্ন আজও টিকে আছে সগৌরবে।

এ রকম কত ইতিহাস আলোর এই শহরকে ঘিরে। ইতিহাসের পাতায় পাতায় চট্টগ্রামকে খুঁজে পাওয়া যায়, নানান রূপ, রং আর বর্ণ-বৈচিত্রে। এখানে জন্ম নিয়েছেন অনেক ক্ষণজন্মা প্রতিভা, যাদের আলোয় আলোকিত দেশ।

পর্তুগিজ, ফরাসী কিংবা আরব বণিকদের মতো পৃথিবীর অনেক দেশের বণিকদেরই পছন্দের জায়গা ছিল এই চট্টগ্রাম। বিদেশি বণিকদের আগমনের সেই সাক্ষী আজও আছে এখানকার ফিরিঙ্গিবাজার কিংবা আনোয়ারার খোট্টাপাড়ায়।

বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সুর্যসারথি মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতার মত ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারি। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে যুবকদের সংগঠিত করতে যে বলি খেলার প্রচলন করেছিলেন আবদুল জব্বার সওদাগর, কালের পরিক্রমায় সেই জব্বারের বলি খেলা আর বৈশাখী মেলা আজও টিকে আছে শতবর্ষ পরেও।

ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি এদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণাও এসেছে এই চট্টগ্রাম থেকে। যে ঘোষণা ইথারে ছড়িয়েছে স্বাধীনতার স্বপ্ন জয়ের নতুন আলোর মশাল।
যখন বিশ্বের বণিকরা সাগরে কিভাবে যাতায়াত করবেন কিংবা সাগরে কিভাবে নিরাপদে চলাচল করবেন- ভাবছিলেন তখন এই চট্টগ্রামের দক্ষ কারিগরেরাই তৈরি করেন কাঠের নৌকা আর যুদ্ধ জাহাজ।

সমুদ্র যাত্রায় ব্যবহৃত সেই জাহাজ আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাদুঘরে স্থান আলো করে আছে। রক্তে মিশে থাকা সেই জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি শিপ ব্রেকিং শিল্পেও এখন চট্টগ্রাম অতুলনীয়। আছে সাগর বিদ্যা নিয়ে অধ্যয়নের প্রিয়স্থান মেরিন একাডেমিও।

চট্টগ্রামের পাশেই সাগরতীরে কক্সবাজারে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা বিশ্বের বৃহৎ বালুকাময় সৈকত সাগরপ্রেমীদের নিরাপদ পছন্দের স্থান। প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের সৌন্দর্য্য যে কাউকে মুগ্ধ করবেই। আছে পাহাড়ের বুনো আকর্ষণের রাঙামাটি, বান্দরবান আর খাগড়াছড়ির বর্ণিল বৈচিত্র্য।

কর্ণফুলীর ঢেউয়ের তালে আজও খুঁজে পাওয়া যায় জীবনের নতুন ছন্দ, যা দুলে উঠে সাম্পানের মনকাড়া শব্দে। দিনে কিংবা রাতে হালদা বা কর্ণফুলী নদী আর নদীপাড়ের সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হবেন না এমন মানুষ মেলা ভার।

এছাড়া মানুষকে প্রবলভাবে কাছে টানে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, পারকী বিচ, সীতাকুণ্ডের ইকোপার্ক, কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নিহত নাবিকদের সমাধিস্থল ওয়ার সিমেট্টি।

যোগাযোগ ব্যবস্থার সামগ্রিক দিক বিবেচনায় চট্টগ্রামকে বেছে নেয়া হয়েছিল আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের হেড কোয়ার্টার হিসেবে, সেই সিআরবি আজো কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। আছে সেই পুরোনো রেলস্টেশন, রেলওয়ে জাদুঘর।

সাগরতীরের জনপদ হওয়ায় হরেক রকমের মাছের পাশাপাশি শুটকি এখানকার মানুষের সংগ্রহে থাকতো সব সময়। যা আজও মানুষের খাদ্যতালিকায় পছন্দের তালিকায় স্থান করে আছে।

চট্টগ্রামকে আবাদ করতে আসা অনেক সুফী সাধকদের মাজার এখানকার এক বড়ো আকর্ষণ। বদর শাহ, আমানত শাহ, বারো আউলিয়া, বায়েজিদ বোস্তামীর মতো সাধকদের মমতায় ধন্য এ নগরী।

তাদের মাজার যেমন আছে তেমনি আছে মুসলমানদের অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ, খ্রীষ্টানদের চার্চ, হিন্দু এবং বৌদ্ধ মন্দির, প্যাগোডাসহ ধর্মীয় উপসনালয়। এ যেন সব ধর্মের, বর্ণের এবং আদিবাসী মানুষের এক মহামিলন মেলা।

চট্টগ্রামকে ঘিরে যে আলোর মশাল ছড়িয়েছিলেন এখানকার পূর্বপুরুষরা, সেই আলোয় আজো আলোকিত এই বিশ্ব। পাহাড়, নদী আর সাগর তীরের এই আলোর শহর বেঁচে থাকবে যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য, মানুষের জীবন বৈচিত্র আর কর্মের মাঝে। তৈরি করবে নতুন নতুন ইতিহাস।

২৫ জানুয়ারি ২০১৩

অন্যান্য কলাম

adv

ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: ০১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: [email protected]