ভারত সফরে খালেদা জিয়া

সৈয়দ আবুল মকসুদ ৩০ অক্টোবর,২০১২
সৈয়দ আবুল মকসুদ

প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমন্ত্রণে ভারত সফর করছেন বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। রাজনীতি-সচেতন মানুষ এবং দুই দেশের পর্যবেক্ষক ও প্রচারমাধ্যম তাঁর এই সফরকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দুই দেশের জনগণের স্বার্থে ঘনিষ্ঠতর করা ইতিহাসের দাবি। কারণ, দুই দেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য অভিন্ন। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই কোনো দেশের রাজনৈতিক ভূগোলের পরিবর্তন ঘটে। সেই বাস্তবতা মেনে না নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ-ভারতের জনগণের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ১৯৪৭-এ। একাত্তরে শুরু হয় আর এক নতুনতর অধ্যায়। স্বতন্ত্র রাজনৈতিক-ভৌগোলিক অস্তিত্ব নিয়ে দুটি ছোট ও বৃহৎ দেশ ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে। তা করতে উপায় খুঁজে বের করা উভয় দেশের নেতাদের কর্তব্য। সেই কর্তব্যটি সঠিকভাবে পালিত হয়নি কোনো দিক থেকেই। দুই দেশের সহযোগিতার যাত্রাপথে সাতচল্লিশ-পূর্ব নেতারা যে কাঁটাগুলো পুঁতে রেখে যান, পাকিস্তান-পর্বের নেতারা তা অতি যত্নে লালন করেন। সেই কাঁটাগুলোর কিছু উৎপাটিত হয় একাত্তরে। তা করেন দুই দেশের নেতৃত্ব ও জনগণ। কিন্তু অবশিষ্ট কাঁটাগুলো উপড়ে ফেলার দায়িত্ব ছিল বাহাত্তর-পরবর্তী নেতৃত্বের। সে দায়িত্ব তাঁরা পালন করেননি। পরিণামে দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হতে পারেনি। কূটনৈতিক প্রথার মধ্যে বৃত্তাবদ্ধ হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অনেকেই তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিবেচনা করেন। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীদের সঙ্গে কলকাতার গড়িয়াহাটার অথবা নিউমার্কেটের পাশের এসি মার্কেটের কাপড়ের দোকানের অবাঙালি মালিকদের সম্পর্ক অতি চমৎকার। ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাংলাদেশের গরু ব্যাপারীদের সম্পর্ক অতি অন্তরঙ্গ। বাংলাদেশের ক্যানসার রোগীদের ও তাদের সঙ্গীদের সঙ্গে ঠাকুরপুকুর বা মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সদের খুব ভালো সম্পর্ক। দুই দেশের চোরাচালানকারীদের মধ্যে যে সম্পর্ক, তার কাছে শ্যালক-ভগ্নিপতির সম্পর্ক কিছুই না। এই যে দুই দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণীর নিবিড় সম্পর্ক, তার সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের কোনো সম্পর্ক নেই।

কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো দলীয় ব্যাপার নয়। কিন্তু বাংলাদেশই সম্ভবত একমাত্র দেশ, যেখানে ভারত-বাংলাদেশ বৈদেশিক সম্পর্ক দলীয় বিবেচনায় ওঠানামা করে। সেটা করে প্রধানত বাংলাদেশের দিক থেকে। ভারতের বৈদেশিক নীতি সহজে পরিবর্তনশীল নয়। তার পরিবর্তন ঘটতে পারে শুধু তাদের জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে। সরকার পরিবর্তনে নয়।

ভারতের প্রধান দল কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক অনেক কালের। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে সে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হয়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন আত্মমর্যাদা রক্ষা করে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব অটুট রাখতে। বাংলাদেশের পাকিস্তানবাদী ও মুসলিম সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সে জন্য তাঁকে ভারতপন্থী বলে সমালোচনা করত। তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর খোন্দকার মোশতাকের সেনা-সমর্থিত সরকার ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ওই সরকারের মুসলিম জাতীয়তাবাদী নীতির প্রতি ভারত সরকারের সমর্থন দেওয়া সম্ভব ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই ভারতের প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশে একটি অসাম্প্রদায়িক সংখ্যালঘুবান্ধব সরকার থাকবে, যা হিন্দুদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের রক্তপাত তাদের সেই প্রত্যাশা চূর্ণ করে দেয়।

ঐতিহাসিক কারণে বাংলাদেশের মুসলমানদের একটি অংশ ভারতের নেতাদের সন্দেহের চোখে দেখে আসছে সাতচল্লিশ-পূর্ব সময় থেকে। মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের মানুষকে অপরিমেয় সাহায্য-সহযোগিতা করা সত্ত্বেও সে সন্দেহ সম্পূর্ণ দূর হয়নি। তা না হওয়ার কারণ পশ্চিমবঙ্গের একশ্রেণীর মানুষের বাংলাদেশের প্রতি বিদ্বিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি। পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ার ভূমিকাও ভালো নয়। দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উসকানিমূলক কথাবার্তার কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভারত-বিরূপতা দেখা দেয়। একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের শুরুতে মোশতাক ও তাঁর সেনাবাহিনীর বন্ধুদের থেকে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম দিনই যখন তাঁর কাজকর্মের মাধ্যমে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে তিনি আওয়ামী লীগ ও ভারতের বন্ধু, তখন আকাশবাণী ও কলকাতা কেন্দ্রসহ কলকাতার পত্রপত্রিকা প্রচণ্ড উল্লাস প্রকাশ করে। তাতে প্রমাণিত হয় যে তিনি সত্যি সত্যি আওয়ামী লীগ ও ভারতের লোক। তাদের হয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। তার পরিণাম হয় এই যে মাত্র তিন দিন পরে যখন খালেদের পতন হয় এবং জিয়াউর রহমানের উত্থান ঘটে, তখন যারা জিয়াকে জানত না, চিনত না তারাও তাঁকে সমর্থন দেয়। সেই দিনগুলোর পরিস্থিতি খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হওয়ায় আমার ধারণা, খালেদের কার্যকলাপে মানুষের ধারণা জন্মে যে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তির উচ্চকণ্ঠ প্রচারণায় সাধারণ মানুষের অনুমানমূলক ধারণাও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সুযোগটি গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। তিনি পাকিস্তানি ধরনের একটি ভারতবিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা ঘটান। তাতে তাঁর সমর্থক ও সহযোগীর অভাব হলো না। নিষিদ্ধঘোষিত মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামের চুপ করে থাকা নেতা-কর্মীরা তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। তাঁদের ও কিছু ভারতবিরোধী অতি বাম গোষ্ঠীর নেতাদের নিয়ে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

 

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মতো বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কখনো বৈরিতামূলক ছিল না, কিন্তু পঁচাত্তরের পর থেকে শীতল হয়। জিয়াউর রহমানের ভারতবিরোধী নীতি ভালোই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর মৃত্যুর পরও থেকে যায় তাঁর জনপ্রিয়তা এবং টিকে যায় তাঁর দলের সরকার। তাতে উৎসাহিত হয়ে ভারতবান্ধব হওয়া সত্ত্বেও জেনারেল এরশাদ আর এক ধাপ বেশি ভারতবিরোধিতার ভান করতেন। তাতেও যখন কাজ হচ্ছিল না, তখন তিনি বাংলাদেশকে ইসলামীকরণ করতে থাকেন। কেউ না চাইতেই সৌদি আরবকে খুশি করতে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ করেন। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সাম্প্রদায়িক ইসলামীকরণ রাজনীতি ভারতের মানুষের ভালো লাগার কথা নয়। যদিও এ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সংস্কৃতির প্রাধান্য মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে কখনোই অস্বীকার করেননি ভারতীয় নেতারা। জিয়া-এরশাদ সরকার বাঙালি সংস্কৃতিও নয়, মুসলিম সংস্কৃতির উন্নতি নয়, বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেন ইসলামি রাজনীতি, যা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভারতে সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশবিরোধী এক শক্তিশালী চক্র, যাদের কারণে বাংলাদেশ তার কিছু ন্যায়সংগত দাবি আদায় করতে পারে না। তাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যারা মোটেই ভারতবিরোধী নয়, তারাও ভারতের প্রতি বিরূপ হয়ে যায়। তাদের ভোটগুলো নির্বাচনের সময় বিএনপি-জামায়াতের গোলায় গিয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করে দুর্বল করে দিতে পারেনি ভারতবান্ধব আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের আগে আগে তারাও মৃদু ভারতবিরোধী হয়ে ওঠে। তারা সাবলীলভাবে মানুষকে বোঝাতে পারেনি আমাদের ভারতবিরোধিতার দরকার নেই। ওটা একটা পাকিস্তানি ধরনের কাঁচা রাজনীতি। ওতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। শেখ হাসিনা তাঁর কীর্তিমান বাবার কাছ থেকেই এক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্তরাধিকারী হয়েছেন। যেমন খালেদা জিয়া উত্তরাধিকারী এক মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতির। দুটো একেবারেই দুই রকম ধারা। সর্বভারতীয় নেতাদের সঙ্গে না হলেও প্রণব মুখার্জি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ পশ্চিমবঙ্গের নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত গভীর বন্ধুত্ব। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ ধরনের সম্পর্ক থাকা ভালো। বাংলাদেশের কোন সরকার হিন্দুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা ভারতীয় নেতাদের বিবেচনার বিষয়। বাংলাদেশের অতীতের যেকোনো সরকারের চেয়ে শেখ হাসিনার সরকার সবচেয়ে হিন্দুবান্ধব। বিএনপি-জাতীয় পার্টির প্রশাসনে হিন্দুরা কখনো অবহেলার কখনো অবিচারের শিকার হয়েছেন। শেখ হাসিনা হিন্দু কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে বিএনপি-জামায়াত-ইসলামী ঐক্যজোটের সরকার এসে একেবারে উল্টো নীতি গ্রহণ করুক, সেটা নিশ্চয়ই ভারত সরকারের কাম্য নয়। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা সম্ভবত সে ব্যাপারে কিছুটা নিশ্চিত হতে চান।

যেসব দেশের অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে, সেসব দেশের মধ্যে কিছু সমস্যা সব সময়ই থাকতে পারে। তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, যদি দুই দেশের নেতৃত্ব সংবেদনশীল হন। সে জন্য দুই দেশের নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকা দরকার এবং দুই দেশের শাসক দলগুলোর মধ্যেও যোগাযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়। খালেদা জিয়ার বর্তমান সফর আর কিছু না করুক সেই কাজটি করতে পারে। সাত দিনে ভারতের নেতা, নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর মতবিনিময় দুই দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারার সৃষ্টি করতে পারে। আমার ভালো লেগেছে যে, খালেদা জিয়ার এই সফরকে আওয়ামী লীগের নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ স্বাগত জানিয়েছেন। অবশ্য তাঁর দলের সংকীর্ণচেতা কেউ কেউ বলেছেন, তিনি নির্বাচনের আগে ‘আশীর্বাদ’ নিতে দিল্লি গেছেন।

আওয়ামী লীগের নেতারা এবং পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিকদের অনেকে শেখ হাসিনার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যক্তিগত সম্পর্কনির্ভর নয়, তা পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর। যদি ব্যক্তিগত সম্পর্কনির্ভর হতো, তা হলে মহাজোট সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেসব খুঁটিনাটি বিরোধ রয়েছে, তিন বছর আগেই তা মীমাংসা হয়ে যেত। মুখ্যমন্ত্রী মমতার সঙ্গে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তাঁর কারণে হোক বা যে কারণেই হোক, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হতে পারেনি। টিপাইমুখ বাঁধসহ বহু বিষয়ের ফয়সালা হয়নি। এসব সমস্যার সমাধান করতে অন্য রকম কূটনৈতিক ও কারিগরি দক্ষতার দরকার। বাংলাদেশ সরকারের তা নেই।

খালেদা জিয়া ভারতে যাওয়ার আগে তাঁর দল থেকে বলা হয়েছে, তিনি তিস্তা চুক্তি, টিপাইমুখ, সীমান্ত হত্যা, সীমানা নির্ধারণ, শুল্কমুক্ত বাংলাদেশের পণ্য প্রভৃতি বিষয়ে ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। কিন্তু যে প্রতিনিধিদল নিয়ে তিনি গেছেন তা দেখে মনে হয় না যে তিনি এসব ব্যাপারে আলোচনায় আন্তরিক। তাঁর সফরসঙ্গীদের মধ্যে পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ কোথায়? আন্তর্জাতিক নদী আইন বিশেষজ্ঞ কোথায়? অতি দুর্বল এক প্রতিনিধিদলের তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্প্রীতি গাঢ়তর করতে দুই দেশের সংস্কৃতির লোকদের ভূমিকা বিরাট। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে বিএনপির বিশেষ মাথাব্যথা নেই। তাঁর সফরসঙ্গীদের মধ্যে বিশিষ্ট কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক এবং সংগীতশিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা থাকতে পারতেন। তবু বলব, বিএনপির নেত্রীর এই সফরটি তাঁর জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে শেখ হাসিনার দূরত্ব সৃষ্টি তিনি করতে পারবেন না। তার প্রয়োজনও নেই। তিনি যা পারেন তা হলো তাঁর নিজের অবস্থান তাঁদের কাছে পরিষ্কার করা। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক এবং জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ক্ষমতায় গেলে তাঁর দল কী পদক্ষেপ নেবে, তার একটি রূপরেখা নিয়ে তিনি ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। ভারত সরকার তাঁকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে শেখ হাসিনাকে যদি মৃদু ভয় দেখায়, তাতে আওয়ামী লীগের ক্ষতি কতটুকু, তার চেয়ে বড় কথা বিএনপির তাতে লাভ। এরশাদ যে কথা বলেছেন, ভোট তো ভারত দেবে না। তিনি অবশ্য প্রায়ই বলছেন, নির্বাচন আদৌ হয় কি না নিশ্চয়তা নেই। তা যদি সত্যি হয়, তা হলেও খালেদা জিয়ার এই সফর মাঠে মারা যাবে না।

শেষ কথাটি যা বলতে চাই তা হলো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। এই জিনিসটি থাকবে দলমতের ঊর্ধ্বে। আওয়ামী লীগের ভারতনীতি আর বিএনপির ভারতনীতি আলাদা হতে পারে; কিন্তু দেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে অভিন্ন। বিএনপির ভারতনীতি যদি ভবিষ্যতেও অপরিবর্তিত থাকে, তা হলে এই সফরের পরও ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব থেকেই যাবে। আমাদের প্রত্যাশা, দুই দেশের প্রধান দলগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসুক।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

সূত্র: প্রথম আলো, ৩০ অক্টোবর ২০১২

অন্যান্য কলাম

adv

ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: ০১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: [email protected]