কানাডার মুসলিম নারীদের সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে আলিয়ার অনন্য উদ্যোগ

১০ ফেব্রুয়ারি,২০১৯

কানাডার মুসলিম নারীদের সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে আলিয়ার অনন্য উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আরটিএনএন
অটোয়া: ফটোগ্রাফার আলিয়া ইউসুফ কানাডায় বসবাসরত অনেক মুসলিম নারীর আলোকচিত্র তুলতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন।

এমন কি ২৩ বছর বয়সী তরুণ এই আলোকচিত্রী কানাডায় বেড়ে উঠা মুসলিমদের সম্পর্কে তার যে ধারণা তা সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে তাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে।

ইউসুফের পরিবার তার ৮ বছর বয়সের সময় মিশর থেকে কানাডায় পাড়ি জমায় এবং তারা কানাডার ভানকুয়েভার নামক স্থানে বসবাস করতে শুরু করেন, যেখানে থাকতে থাকতে একসময় আলিয়া ইউসুফ তার মুসলিম পরিচয় কিভাবে লুকাতে হয় তা পুরোপুরি শিখে গিয়েছিলেন।

কানাডার টরোন্টোর তরুণ আলোকচিত্রী হিসেবে আলিয়া ইউসুফ সিদ্ধান্ত নেন যে, মুসলিম নারীদের সম্পর্কে ছড়িয়ে থাকা নেতিবাচক ধারণাসমূহ দূর করার জন্য একই সাথে তার দায়িত্ব এবং যোগ্যতা দুটোই রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মুসলিম নারীদের একটি একক প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়েছে যা বারবার তাদের গায়ে সেঁটে দেয়া হয়। সবাই মনে করেন, সকল মুসলিম নারী শোষণের শিকার, তারা নীরব, তাদের জীবনের উপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তাদের জীবন পরিচালিত হয় তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ইচ্ছানুসারে।’

আলিয়া ইউসুফ মুসলিম নারীদের সম্পর্কে এসব নেতিবাচক ধারণা দূর করার জন্য ‘The Sisters Project’ নামে কানাডার মুসলিম নারীদের নিয়ে একটি আলোকচিত্র ধারণের প্রকল্প হাতে নিয়েছেন এবং একই সাথে তিনি এর মাধ্যমে কানাডায় বসবাসরত মুসলিম নারীদের সামাজিক অবদানসমূহ তুলে ধরেন।

আর এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিনি কানাডার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন এবং দেশটির অন্তত ২০০ মুসলিম নারীর আলোকচিত্র ধারণ করেছেন।

বর্তমানে তিনি কানাডার টরোন্টো শহরের রাইয়াসন ইমেজ সেন্টারে ‘The Sisters Project’ নামক প্রকল্পে ধারণকৃত আলোকচিত্রগুলোর সমন্বয়ে তার প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন।

তিনি আশা করেন এর মাধ্যমে তিনি কানাডার মুসলিম নারী, মুসলিম জনগণ এবং তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পর্কে একটি ধারণা দিতে পারবেন।

নিচে তার কিছু আলোকচিত্রের মডেলদের সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

আয়ান:
আয়ান নামের এই মুসলিম নারী বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই যে, একজন কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম নারী হিসেবে আমার কিছু অযাচিত অভিজ্ঞতা রয়েছে, কারণ আমি সবসময় আমার বর্ণ এবং ধর্ম নিয়ে চিন্তিত থাকি।’

‘যখন আমি ছোট ছিলাম সেসময় আমি ভাবতাম যে, আমি সমাজেরই অংশ এবং তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম যে, লোকজন আমার সাথে যোগাযোগ করার সময় কিভাবে তাদের মনোভাব পাল্টে নেয়।’

আয়েশা
আয়েশা নামের এই মুসলিম নারী বলেন, ‘ জীবনে অনেক উপহার পেয়ে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি এবং অগুণতিত এসব উপহারের প্রায় সবগুলোই আমি নিজে অর্জন করে নেইনি, শুধুমাত্র ভাগ্যই এগুলোকে আমার নিকটে এনেছে।’

‘বিভিন্ন বর্ণের নারী হিসেবে আমরা আমাদের কষ্টার্জিত কাজ সমূহের অবমূল্যায়ন করি, কিন্তু আমরা কঠোর পরিশ্রম করি। আমার জীবনে আমি অনেক কঠোর শ্রম দেয়া নারীর সাথে দেখা করেছি যাদের অধিকাংশই ভিন্ন বর্ণের।’

ডাইহিয়া
ডাইহিয়া নামের এই নারীর ভাষায়- ‘আমার হিজাব আমার ধর্মের প্রতিনিধি এবং লোকজন আমাকে স্বাগত জানায় এই ভেবে যে, আমি সিরিয়া থেকে আগত কোনো উদ্বাস্তু।’

‘আমি প্রথাগত ধারণা ভেঙ্গে দিতে পছন্দ করি, সুতরাং লোকজন আমাকে নিয়ে ঠিক কি ভাবল তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা যাই চিন্তা করুক না কেন আমি তা আমার অনুকূলে নিয়ে নিই।’

ফাতিমা
ফাতিমা নামের মুসলিম নারী বলেন, ‘মোটরসাইকেল চালানোর সময় আমি সবচেয়ে যা উপভোগ করি তা হচ্ছে, যখন আমি আমার হেলমেট সরিয়ে নিই এবং লোকজন আমার হেলমেটের ভিতরে আমার হিজাব দেখে অবাক হয়।’

‘এটি আমাকে হাসায়। কারণ কেউই আশা করে না যে, আমি হিজাব পরিধানকারী কোনো নারী। এই কারণেই আমি সেইসব নারীদের সম্পর্কে লোকজনের ধারণা পরিবর্তন করে দিতে চাই যারা পরিবর্তনের জন্য হিজাব পরিধান করেন।’

ফাইয়ে
তিনি বলেন, ‘আমি লোকজনের ধারণার চাইতেও বেশি কিছু করি।’
‘আমি অনেক দিন যাবত এটি করতে পছন্দ করি এবং আমি জানি এটা আমার পরিবারের জন্য কঠিন। আমি মনে করি আমি সবকিছু খুব দ্রুত শিখতে পারি এবং নিজের প্রশ্নসমূহের উত্তর খুঁজতে পারি।’

রান্ডা
রান্ডা নামের এই নারী বলেন, ‘মুসলিম নারীদের সম্পর্কে সবচাইতে বড় ভুল ধারাণা হচ্ছে, তারা শোষণের শিকার যা একই সাথে বড় একটি রসিকতা।’

‘যখনই আমি এ ধরনের কিছু শুনতে পাই আমি তখন হাসি। এমনকি আমি প্রতিবাদ করার জন্য তাদের সময় দিই না কারণ যদি আমি তাদেরকে বলি যে, আমরা কত সৌভাগ্যবান তখন তারা তা বিশ্বাস করতে পারবে না।’

জায়নাব
তিনি বলেন, ‘আমি অনুভব করি যে, অন্যদের নিকটে আমি কি এমন কেউ হয়ে পড়েছি যে তার নিজের প্রেক্ষাপটে হারিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমি এমন একজন যে জন্ম নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার জন্যই।’

‘আমি অন্যদের নিকট নিজেকে একজন যোদ্ধা হিসেবে দেখতে চাই। যে একই সাথে শক্তিশালী এবং যার কোনো ভয় নেই।’

আলেয়া
আলেয়া নামের এই মুসলিম নারী বলেন, ‘আমি চাই এমন একজন হতে যার চিন্তা চেতনা, কথা বার্তা এবং কাজকর্ম ইসলামের মূলনীতি সমূহের প্রতিনিধিত্ব করে যাতে করে মুসলিম নারীদের সম্পর্কে গতানুগতিক চৌহদ্দির মধ্যে আঁটকে থাকা নেতিবাচক ধারণাসমূহ দূর করা যায়।’

সাবা
তিনি বলেন, ‘যদি কোনো কিছুর উন্নয়ন করা প্রয়োজন তবে আমি চাইবো যে, এটি পরিবর্তন করতে যে অন্যরা যাতে আমাদের স্বনির্ভর ভাবেন।’

‘আমরা আমাদের নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিই। আমাদের ধর্ম, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের পরিবার আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। চূড়ান্তভাবে আমরা নিজেরাই আমাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, যেমনটি অন্যরা নিয়ে থাকে।’

ইদিল
ইদিল নামের এই কানাডিয়ান মুসলিম নারী বলেন, ‘আমি একজন কানাডিয়ান, এবং আমি নিজের পরিচয় নিয়ে গর্বিত।’

‘আমার সফর আমাকে যেখানেই নিয়ে যায় না কেন, এটি আমাকে শেষ অবধি একজন কানাডিয়ান হিসেবেই চিত্রায়িত করে, যা অতীতের সাথে গাঁথা এবং আমাকে ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী করে।’

সূত্র: সিবিসি ডট সিএ।

মন্তব্য

মতামত দিন

আমেরিকা পাতার আরো খবর

যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম মুসলিম নারী মেয়র হয়ে ইতিহাস গড়লেন ড. সাদাফ জাফর, সাক্ষাৎকারে যা বলছেন

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনওয়াশিংটন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন অঞ্চলের উত্তরের শহর মন্টগোমেরির প্রথম মুসলিম নারী মেয়র হিসেব . . . বিস্তারিত

যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গরাই সবচেয়ে বর্ণিল, অর্ধেকই ধর্মান্তরিত

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনওয়াশিংটন: এমনকি বিংশ শতাব্দীতেও যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ অঞ্চলে যখন ইসলামের উপস্থিতি একেবারেই কম . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com