দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ

পুতিনের সঙ্গে দর-কষাকষি, চরম মূল্য দিতে হবে ট্রাম্পকে

১০ ফেব্রুয়ারি,২০১৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আরটিএনএন

ওয়াশিংটন: একবার জর্জ ডব্লিউ বুশ ভ্লাদিমির পুতিনের চোখের দিকে তাকালেন এবং ভাবলেন তিনি পুতিনের অন্তর-আত্মাকে দেখেছেন।কিন্তু তিনি ভুল ছিলেন। বারাক ওবামা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ‘পুনঃস্থাপনের’ চেষ্টা করেছেন কিন্তু তার মেয়াদের শেষ পর্যায়ে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নিলে ইউক্রেনসহ বিশ্বের সবত্র দ্বন্দ্বকে নাড়িয়ে দেয় এবং ওবামার সিরিয়া ত্যাগের মাধ্যমে ক্ষমতার শূন্যস্থান পূরণ হয়।


কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো অনেক দূর যেতে চান বলেই মনে হচ্ছে এবং তা রাশিয়ার সঙ্গে একটি ‘সম্পূর্ণ’ নতুন ‘কৌশলগত’ উপায়ে। তিনি সফল হতে পারেন অথবা পুতিনের দ্বারা প্রতারিতও হতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি পুতিনের দ্বারা প্রতারিত আমেরিকার প্রেসিডেন্টের তালিকায় তৃতীয় হবেন।


পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের পুনর্নির্মাণের বিস্তারিত বিবরণ এখনো অস্পষ্ট এবং যেকোন সময় তা পরিবর্তন করা হতে পারে; যদি তার ‘ইনার সার্কেলে’ আংশিক মতবিরোধ হয়। অন্যদিকে, জাতিসংঘে তার রাষ্ট্রদূত ইউক্রেন নিয়ে ‘রাশিয়ার আগ্রাসী কর্মের’ সুস্পষ্ট নিন্দা জানিয়েছেন।


পুতিনের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখনো ধিকিধিকি জ্বলছে। চলতি সপ্তাহে ফক্স নিউজের ইন্টারভিউয়ার এক সাক্ষাত্কারে পুতিনকে একজন ‘হত্যাকারী’ হিসেবে চিহিৃত করলে প্রতি উত্তরে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘বিশ্বজুড়ে অনেক খুনি রয়েছে। কাকে আপনি আমাদের দেশের এত নির্দোষ মনে করেন?’


আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্টের জন্য সুপারিশ যে, রাশিয়ার মতো একটি খুনি দেশকে মেনে নেয়া আমেরিকার জন্য অভূতপূর্ব ও পুরোপুরি ভুল এবং মস্কোর অপপ্রচারের একটি উপহার। ট্রাম্প মনে করছেন, পুতিন আমেরিকাকে অনেক কিছু প্রস্তাব করেছে। কিন্তু তার এই ধারনা ভুল। তার এই অফার কেবল রাশিয়ার ক্ষমতা ও স্বার্থের জন্যই এবং এর বিনিময়ে আমেরিকাকে অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হবে।


ট্রাম্পের অনর্থক কথাবার্তায় রাশিয়া ভালো কিছু দেখছে। তারা মনে করছে, ‘মৌলবাদী ইসলামি সন্ত্রাসীদের’ বিশেষকরে ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) ধ্বংস করতে আমেরিকা পুতিন সঙ্গী হবে। একই সময়ে আমেরিকা মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পুরানো শত্রু ইরানের সঙ্গে রাশিয়া তার সহযোগিতা চুক্তি পরিত্যাগ করতে সম্মত হবে।

 

ইউরোপে ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়া তার উসকে দেয়া দ্বন্দ্ব বন্ধ করতে পারে। তার দোরগোড়ায় ন্যাটোর সদস্যদের হয়রানি না করার বিষয়ে একমত হতে পারে এবং সম্ভবত পরমাণু অস্ত্র-নিয়ন্ত্রণ আলোচনা শুরু করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চীনের সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।


ট্রাম্পের সবচেয়ে ‘ভীতিকর উপদেষ্টা’ স্টিফেন বেনন গত বছর বলেছিলেন, ‘আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরে আমরা যুদ্ধ করতে যাচ্ছি এবং এতে কোন সন্দেহ নেই।’ যদি তাই হয়, আমেরিকার জন্য মিত্র প্রয়োজন হবে এবং রাশিয়া হচ্ছে অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং চীনের সঙ্গে দেশটির ২,৬০০ মাইল সীমান্ত রয়েছে। সুতরাং রাশিয়াকে কেন পছন্দ নয়?


এপর্যন্ত প্রায় সবকিছুই চমৎকার। রাশিয়ান হ্যাকিং নির্বাচনে ট্রাম্পকে সাহায্য করেও থাকতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি পুতিনকে বিশ্বাস করতে পারেন। কেননা ক্রেমলিনের স্বার্থের সঙ্গে আমেরিকার স্বার্থ পুরোপুরি ভিন্ন।


উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়ায় আইএস সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে পুতিন একটি বড় ধরনের গোলমাল তৈরি করেছেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে বাস্তব কোন প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন না। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী রাশিয়ান সামরিক উপস্থিতি বাশার আল-আসাদের জন্য নিরাপদ হতে পারে। তার শাসনে দুই বা তিন মিনিটের বিচারে হাজার হাজার সিরীয়কে ফাঁসি দেয়া হয়েছে; যা চলতি সপ্তাহে একটি মানবাধিকার সংস্থার রির্পোটে প্রকাশ করা হয়েছে।


এর কোনটিই সিরিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা কিংবা আমেরিকা জন্য সুখকর নয়। এমনকি পুতিন এবং ট্রাম্প মিলে যদি একটি সাধারণ লক্ষ্য শেয়ার করলেও আমেরিকানরা রাশিয়ান নৃশংসতার সঙ্গে নিজেদের জড়িত করবে বলে মনে হয় না। আমেরিকান এবং রাশিয়ান বাহিনী সহজেই পাশাপাশি যুদ্ধ করতে পারবে না। কারণ তাদের সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করে না।


তা করতে হলে প্রয়োজন সামরিক গোপন তথ্য শেয়ার করা যে, আমেরিকানদের ভাগ্য রক্ষায় পেন্টাগন ব্যয় করছে। এছাড়া, রাশিয়ান যুদ্ধবিমান জোটের বিমান বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়নি। এমনকি পুতিনের স্থল বাহিনীকে জোটের বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা কম।


অনুরূপভাবে, রাশিয়া ইরানের মুখোমুখি হতে চান না। দেশটির সেনারা রাশিয়ান বিমান বাহিনীর একটি সম্পূরক হিসেবে কাজ করছে। রাশিয়ান পণ্যের রপ্তানির জন্য ইরান হচ্ছে একটি সম্ভাবনাময় বাজার এবং সর্বোপরি, দেশ দুটি এক অপরের প্রতিবেশি। মধ্যপ্রাচ্যেকে পরিচালনা করতে দেশ দুটি অনেক দিন ধরেই একসঙ্গে কাজ করে আসছে।


ধারণা করা হচ্ছে যে, চীনের বিরুদ্ধে রাশিয়া আমেরিকার জন্য একটি ভাল মিত্র হবে কিন্তু এর বাস্তবতাও কম। রাশিয়া চীনের চেয়ে অনেকাংশে দুর্বল। রাশিযার পড়ন্ত অর্থনীতি ও জনসংখ্যা এবং ছোট সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোনভাবেই চীনের তুলনা করা যাবে না।


বেইজিংয়ের সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার ইচ্ছা কিংবা ক্ষমতা কোনটাই পুতিনের নেই। এর বিপরীতে তিনি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যকে অধিক মূল্য দিয়ে থাকেন। একই সঙ্গে তিনি চীনের সামরিক শক্তিকেও সম্ভবত ভয় করেন এবং দেশটির নেতাদের সঙ্গে তার অনেক মিল রয়েছে।


পুতিনের স্বভাব হচ্ছে প্রতিবেশিদের ভয় দেখানো এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে পাশ্চাত্যের লেকচার প্রত্যাখ্যান করা। চীনের সঙ্গে আমেরিকার মুখোমুখি হওয়াটা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেলেও পুতিন মোটেই আমেরিকার কোন সাহায্যে আসবে না।


যাইহোক, ট্রাম্পের গুরুতর ঝুঁকি হচ্ছে ইউরোপ নিয়ে তার ভুল অনুমান। এখানে পুতিনের ইচ্ছাতালিকা তিনটি শ্রেণির মধ্যে পড়েছে। প্রথমত, রাশিয়ার ওপর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয়া পর্যন্ত তিনি ভাল আচরণ করবেন না। দ্বিতীয়ত, তার ইউক্রেন দখলের স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি শান্ত হবেন না। তৃতীয়ত, নিয়মভিত্তিক গ্লোবাল অর্ডার ক্রমশ দুর্বল করার অস্ত্র হিসেবে ন্যাটোকে দুর্বল করতে আমেরিকাকে রাজী করানো।


পুতিন ট্রাম্পকে ভালবাসবেন যদি তিনি (ট্রাম্প) রাশিয়ার নিকট প্রতিবেশিদের ব্যাপারে তাকে সহায়তা করেন। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র বিরোধী প্রতিরক্ষা বাতিল করা এবং ন্যাটোর বিস্তারকে রোধ, বিশেষকরে মন্টিনিগ্রোর সদস্যপদ লাভকে থামিয়ে দেয়া। ট্রাম্পকে এজন্য কত বড় ছাড় দিতে হতে পারে তা তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে না।


তিনি ন্যাটোর গুরুত্ব সম্পর্কে মিশ্র সংকেত দিয়েছেন। গত মাসে তিনি এটিকে ‘সেকেলে’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে, চলতি সপ্তাহে তিনি এটিকে সমর্থন করার অঙ্গীকার করেছেন। ইইউ খণ্ড বিখণ্ড হয়ে গেলে কি ঘটবে সে ব্যাপারে তার কিছু উপদেষ্টার ধারণা আছে বলে মনে হচ্ছে না। পুতিনের মত তারা (উপদেষ্টারা) ম্যারিন লি পেনের মতো নেতাদের আলিঙ্গন করেছেন। যদিও তার তেমন কোন গুরুত্ব নেই। অন্যদিকে, বেনন স্বীকার করেছেন যে, রাশিয়া তার ক্ষমতার অপব্যবহার করছে।


দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে মো. রাহুল আমীন

মন্তব্য

মতামত দিন

আমেরিকা পাতার আরো খবর

ক্যালিফর্নিয়ায় ট্রাম্প সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্য তুমুল সংঘর্ষ

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনক্যালিফর্নিয়া: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট . . . বিস্তারিত

যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটিতে নাইটক্লাবে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ১, গুলিবিদ্ধ ১৪

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনওয়াশিংটন: মার্কিন যুক্তরাজ্যের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনসিনাটি শহরের ক্যামেও নাইট ক্লাবে অজ্ঞাত বন্ . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গোলাম রসুল প্লাজা (তৃতীয় তলা), ৪০৪ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com