বিশ্বের সবচেয়ে ছোট উপগ্রহ বানালেন ভারতের তরুণ বিজ্ঞানীরা

২৮ জানুয়ারি,২০১৯

বিশ্বের সবচেয়ে ছোট উপগ্রহ বানালেন ভারতের তরুণ বিজ্ঞানীরা

ডেস্ক নিউজ
আরটিএনএন
দিল্লী: কালামস্যাট-ভি-টু নামে বিশ্বের সবচেয়ে হালকা একটি স্যাটেলাইট উপগ্রহ ডিজাইন ও নির্মাণ করেন বিশ্বজুড়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ভারতের একটি তরুণ বিজ্ঞানীর দল।

এক কেজি ২৬০ গ্রাম ওজনের ওই উপগ্রহটি তারা তৈরি করেছেন মাত্র ছয় দিনের মাথায়, যেটা কিনা কক্ষপথে সফলভাবে উৎক্ষেপন করা সম্ভব হয়। খবর বিবিসি বাংলার

শিক্ষার্থীদের সেই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ভারতের ১৯ বছর বয়সী স্নাতক পড়ুয়া এক তরুণ। নাম রিফাথ শারুক। সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও যিনি দাপটের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাত জনের ওই দলটিকে।

নিজেদের উপগ্রহের সফল উৎক্ষেপনের খবর পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, দলে নেতৃত্ব দেওয়া রিফাথ শারুক বলেন, আমরা ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমরা পরে আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। ওটা আমাদের জন্য খুব আবেগঘণ মুহূর্ত ছিল। যেটা আসলে কোন ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না।

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা-ইসরো তাদের ক্ষুদ্র এই উপগ্রহটি গত বৃহস্পতিবার একটি রকেটের মাধ্যমে কক্ষপথে সফলভাবে নিক্ষেপ করে। কিন্তু উপগ্রহের ব্যাপারে এমন একটি অনভিজ্ঞ দল কিভাবে এমন ক্ষুদ্র আকারের একটি স্যাটেলাইট তৈরি করে সেটাকে আবার মহাকাশে চালু করতে পারলো?

রাতারাতি সেলিব্রিটি?
উপগ্রহটির সফল উৎক্ষেপণের ঘটনায় দলের সদস্যদের প্রতি প্রশংসা বাণী আসতে শুরু করে বিভিন্ন মহল থেকে।

এ ব্যাপারে শারুক বলেন, এ ঘটনায় আমরা রাতারাতি তারকা বনে যাইনি। এর পেছনে আমাদের বছরব্যাপী কঠোর পরিশ্রম জড়িয়ে আছে।

কালামস্যাট-ভি-টু নামের এই উপগ্রহটির নামকরণ করা হয়েছে ভারতের প্রয়াত ও সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং মহাকাশ গবেষণার বিশিষ্ট পথিকৃৎ ড. এ পি জে আব্দুল কালামের নামানুসারে।

কিভাবে শুরু হয়েছিল?
ভারতীয় এই দলটি কালামস্যাট-ভি-টু নির্মাণের ক্ষেত্রে এ যাবতকালের প্রমাণিত এবং পরীক্ষিত মডেলগুলি অনুসরণ করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

শারুক জানান, পূর্ববর্তী উপগ্রহগুলি তৈরির সময় আমরা যে জ্ঞান অর্জন করেছিলাম সেগুলোই পরে আমাদের কাজে এসেছে। কিন্তু তারপরও আমরা অনেক উদ্ভাবনী আইডিয়া নিয়ে এসেছি। ইসরোর বিজ্ঞানীরা শুরু থেকে, মানে বলতে গেলে উপগ্রহের নকশা আঁকার পর্যায় থেকে আমাদের সাহায্য করে আসছেন। যখনই আমাদের কোন বিষয় নিয়ে সন্দেহ হয়েছে আমরা তাদের পরামর্শ নিয়েছিলাম।

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা- ইসরো ওই উপগ্রহটি অতিরিক্ত পে-লোড হিসেবে বিনে পয়সায় বহন করে মহাকাশে নিয়ে যায়।

গত বৃহস্পতিবারের ওই উৎক্ষেপণের পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশে একটি সামরিক উপগ্রহ নিক্ষেপ করা।

শারুক বলেন, আমরা ইসরো থেকে যে সহায়তা পেয়েছি, তার জন্য আমরা অনেক কৃতজ্ঞ। যদি আমরা বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত রকেট দিয়ে উপগ্রহটি মহাকাশে নিক্ষেপ করতাম তাহলে তারা এই উপগ্রহের জন্য ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ডলার দাবি করতো। যেটা কিনা আমাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না।

উপগ্রহটি তৈরি করতে আমাদের খরচ পড়েছে প্রায় ১৮ হাজার ডলারের মতো। এটা অপেশাদার রেডিও যোগাযোগে সাহায্য করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। যেটা মহাকাশে প্রায় দুই মাসের মতো টিকবে।

এই দলটি চেন্নাইয়ে মহাকাশ গ্রেডের অ্যালুমিনিয়াম সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সময়ের অভাবের কারণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়।

আমরা উপগ্রহটি নকশা করার জন্য দুই দিনের মতো সময় নিয়েছিলাম। বাকি সময় লেগেছে সেটা নির্মাণ এবং পরীক্ষার জন্য।

দক্ষিণ ভারতের বন্দর নগরী চেন্নাইয়ের একটি বাণিজ্যিক এলাকায় ছোট একটি ফ্ল্যাটকে অফিস কক্ষ বানিয়ে উপগ্রহ নির্মাণের কাজ করছিল দলটি। এই শহরটি এক সময় মাদ্রাজ নামে পরিচিত ছিল।

তরুণ এই দলে সবার সিনিয়র ছিলেন ২১ বছর বয়সী জাগনা সাই। তিনি মাত্র কয়েক মাস আগে মহাকাশ প্রকৌশলবিদ্যায় তার ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। তিনি এই দলটির সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্বে পালন করেছেন। কয়েক বছর আগে নাসার একটি সফর তার জীবন পাল্টে দেয়।

তিনি বলেন, নাসায় আমি যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের বেশ কয়েকটি অভিযান সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছি এবং নভোচারীদের সঙ্গেও দেখা করেছি। এটা আমাকে ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

নির্ঘুম দিনরাত্রি
গত চার বছর ধরে মহাকাশ অধ্যয়ন প্রতিষ্ঠান 'স্পেস কিডস ইন্ডিয়া'র সঙ্গে কাজ করেছেন জাগনা সাই। যা এই প্রকল্পের পেছনে প্রধান প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

আমরা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছিলাম। ওই ছয়টা দিন আমরা প্রত্যেকে প্রতি রাতে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছি। এমনকি খাবার দাবার নিয়েও চিন্তা করার সময় ছিল না।

ষষ্ঠতম দিন আমরা উপগ্রহটি ইসরো ফ্যাসিলিটিতে নিয়ে যাই এবং সেখানে এটার শক টেস্ট আর ভাইব্রেশন অর্থাৎ কম্পন টেস্ট করা হয়।

যখন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা আমাদের জানান যে উপগ্রহটির সবকিছু ঠিকঠাক আছে, ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। সে এক চমৎকার অনুভূতি।

আমরা আমাদের অফিসের একটি রুম পরিষ্কার করে সেখানে উপগ্রহটি সমন্বয়ের কাজ করেছি। যতবার আমরা উপগ্রহের কোন অংশ পেয়েছি, সেটা আমরা ততবার আমাদের প্রার্থনার ঘরে নিয়ে গিয়েছি (যেখানে দেবদেবীর মূর্তি রাখা হয়) এবং ঈশ্বরের থেকে আশীর্বাদ কামনা করেছি। প্রার্থনা ছাড়া এসব কিছুই সম্ভব হতো না।

স্পেস কিডস ভার্সনের প্রধান ৪৫ বছর বয়সী উদ্যোক্তা শ্রীমতী কেসান, মহাকাশ গবেষণার জন্য কিছু কর্পোরেট তহবিল পাচ্ছেন। কিন্তু এই ধরণের ছোট প্রকল্পের অর্থায়ন তিনি নিজের পকেট থেকেই করেন।

দলটি এখন আরকটি উপগ্রহ নির্মাণের কাজ করছে যা এই বছরের শুরুতে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

ওই উপগ্রহটি জৈব পরীক্ষা পরিচালনার পাশাপাশি মহাকাশের বাইরে বিকিরণ মাত্রা পর্যবেক্ষণ করবে।

জাগনা সাই বলেছেন, উচ্চ প্রযুক্তি-সম্পন্ন পরীক্ষাগার আর অর্থায়নের অভাব থাকলেও তাদের এই দলটি লক্ষ্য থেকে সরে যায়নি।

তিনি বলেন, আমরা বিকল্প প্রযুক্তি এবং পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেক কিছু করতে পারি। আমরা এখন আর এতো অর্থ বা সুবিধা চাই না। আমাদের কেবল সুযোগের প্রয়োজন।

তাদের এই প্রকল্পের নেতা রিফাথ শারুক, যিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে স্যাটেলাইট ডিজাইনে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তিনি এখনও সমান দাপটে এগিয়ে চলছেন।

তিনি বলেন, মহাকাশ শিল্প অনেক পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক উদ্ভাবনের ঘটনা ঘটছে উপগ্রহ তৈরির ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের বিষয়টি খুব দারুণ।

মন্তব্য

মতামত দিন

এশিয়া পাতার আরো খবর

পুলওয়ামাতে হামলার জের: ভারতের নানা প্রান্তে কাশ্মীরিদের হেনস্থা

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনকাশ্মীর: তিনদিন আগে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে আত্মঘাতী হামলায় চল্লিশজনেরও বেশি ভারতীয় . . . বিস্তারিত

পুলওয়ামা হামলা: পাকিস্তানকে কী করতে পারে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনইসলামাবাদ:ভারত শাসিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় জঙ্গী হামলায় ৪০ জনেরও বেশী কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা রক্ . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com