যুদ্ধ শেষের ৮ বছর পরও ঐক্য নেই শ্রীলংকায়

১৯ মে,২০১৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আরটিএনএন

কলম্বো: ২০০৯ সালের ১৮ মে। নন্দিকাদল খাড়ি আর বঙ্গোপসারের মাঝখানে থাকা উত্তর-পূর্ব শ্রীলঙ্কার মুল্লিওয়াইক্কিল নামে ছোট্ট এক ফালি ভূখণ্ডে শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ ৩০ বছরের গৃহযুদ্ধের রক্তাক্ত অবসান ঘটলো।


ওটা ছিল এলটিটিই’র শেষ দুর্গ। দারিদ্র-পীড়িত মাছ ধরার ওই এলাকাটি যুদ্ধশেষের আট বছর পরও বিধ্বস্ত রয়ে গেছে। শান্তির আলো দেখার বদলে এখনো সেখানকার মানুষ বোমায় ধসে পড়া ভুতুরে বাড়িগুলোতে বাস করছে। ভয়াবহ ওই যুদ্ধের ক্ষত এখনো যেসব এলাকা ভয়াবহভাবে বয়ে বেড়াচ্ছে, এই এলাকাটি তার একটি।

উত্তরের তামিলরা ১৮ মে দিনটিকে নীরব গুমট আবহাওয়ায় মৃত্যু দিবস হিসেবেই পালন করে। আর কলম্বোতে দিনটিকে বিবেচনা করা হয় বিজয় দিবস হিসেবে। সামরিক বাহিনী-সংশ্লিষ্ট অনেক অনুষ্ঠানও হয়ে থাকে দিনটিতে।


সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসের আমলে তামিলদের দুর্দশার কাহিনী প্রকাশ্যে বলা হতো না। তবে প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার আমলে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। তারা কিছু কিছু কথা বলতে শুরু করেছে।


তবে নর্দার্ন প্রভিন্সের মুখ্যমন্ত্রী সি ভি বিগনেশ্বরন এবার শোক দিবস পালনের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, আদালতের নির্দেশে তা করা যায়নি। অবশ্য এমনটা অস্বাভাবিক ছিল না। উগ্রবাদী তামিল নেতা হিসেবে পরিচিত বিগনেশ্বরন এর আগে সামরিক বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিলেন।


তার দাবি, যুদ্ধাপরাধীরা শাস্তি পাক বা না পাক, আন্তর্জাতিক তদন্ত হলে ‘সত্যিকারের কাহিনীগুলো’ বের হয়ে আসবে। কথিত ‘বিশ্বাসযোগ্য’ ভাষ্যের ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৬-২০০৯ সালের যুদ্ধে প্রায় ৪০ হাজার বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। শ্রীলঙ্কা সরকার দাবি করছে, নিহতের সংখ্যা মাত্র আট হাজারের মতো। তবে নিরপেক্ষ কোনো সূত্র এখন পর্যন্ত যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করেনি। আবার তামিল সূত্রগুলো কিন্তু ২০০৯ সালে দখলে থাকার সময় এলটিটিইর হাতে নিহত সিংহলি, মুসলিম এবং খোদ তামিল নিহত হওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করছে না।


এসব ঘটনাই তামিল ও সিংহলি রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর গড়ে তুলে রেখেছে। সিংহলি, তামিল এবং সেইসাথে মুসলিমরাও মনুষ্য-সৃষ্ট যুদ্ধে অবর্ণিত দুর্ভোগ বয়ে বেড়াচ্ছে। আর এটাই ঐক্য-প্রক্রিয়াকে হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করেছে।


শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্ব এলাকায় স্বাভাবিক জীবনধারা সৃষ্টির আগে অনেক বিষয়ের সুরাহা করতে হবে। বিপুলসংখ্যক যুদ্ধ-বিধবা এবং পঙ্গু লোক এখনো যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া সশস্ত্র বাহিনী যে ৬০ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল, তার মধ্যে ২০০৯ সালের মে মাস থেকে ৩০ হাজার একর জমি ফিরিয়ে দেওয়া হলেও বাকিটা ফেরতপ্রক্রিয়া অনেক ধীর গতিতে হচ্ছে। পল্লী এলাকায় তামিলরা মূলত কৃষিজীবী। খুব কম লোকই কোনো ব্যবসা বা শিল্পের সাথে জড়িত। যারা জড়িত, তারাও মূলত খুব স্বল্প মাত্রায় এতে সম্পৃক্ত।


তামিলদের, বিশেষ করে সাবেক এলটিটিই ক্যাডারদের আস্থা অর্জনে আট বছরে তেমন কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক মাওবাদী ক্যাডারদের মূলধারায় মিশিয়ে দিতে নেপালে যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, তেমন কিছু গ্রহণ করতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। নেপালে মাওবাদী ক্যাডারদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় কিছু তামিলকে পুলিশ বাহিনীতে নেওয়া হলেও প্রক্রিয়াটির মধ্যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে না।


শ্রীলংকার উচিত ছিল যুদ্ধের পরপরই আস্থা সৃষ্টির ব্যাপকভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের বিখ্যাত ‘আর কোনো সংখ্যালঘু থাকবে না’ মন্তব্যটির রেশ ধরে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত সহজেই। রাজাপাকসে যদিও বিশাল বিশাল প্রকল্প নিয়েছিলেন। বিশেষ করে জাফনা নতুন করে গড়া, উত্তর ও দক্ষিণকে সংযোগকারী কলম্বো রেলওয়ে ও মহাসড়ক নির্মাণ কার্যক্রমের কথা বলা যায়। কিন্তু এসব প্রকল্প সিংহলি ও তামিলদের মধ্যকার ব্যবধান কমাতে খুব বেশি ভূমিকা পালন করেনি।


উত্তরে শিল্প ও বাণিজ্য সৃষ্টির দায়িত্বশীল এক তামিল সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, সরকার ঐক্য-প্রক্রিয়ার লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যটনকে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বিপরীতে যেটা হয়েছে, তা বিভেদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রচ্ছন্ন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পল্লী এলাকা থেকে যেসব সিংহলি যুদ্ধের পরপরই উত্তর-পূর্ব এলাকা সফর করেছে, তারা যুদ্ধ জয়ের মানসিকতা জোরদারই করেছে।


বৌদ্ধ-প্রাধান্যের দেশ শ্রীলঙ্কায় গত আট বছরে যে জিনিসটির অভাব ছিল তা হলো সত্যিকারের সহানুভূতি, সত্যিকারের সামগ্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ, ভীতিহীন আস্থা সৃষ্টি। তাদের উচিত ছিল, এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, যাতে কোনো লোক আবার অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার প্রয়োজনের কথা না ভাবে। এমন কিছু না করাতেই উগ্র জাতীয়তাবাদীদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। উত্তরের এলাকা থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা কিংবা তামিলদের গ্রহণ করার মাধ্যমে অবয়ব বদলিয়ে সত্যিকারের শ্রীলঙ্কা সামরিক বাহিনী সৃষ্টির পরামর্শগুলোতে বেশির ভাগ সিংহলি আনাড়িপনা ও বোকামি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এতে করে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আট বছর পরও গভীর জীবনবোধের বৌদ্ধ দর্শনের সূচনা এবং সাবেক এলটিটিই সমর্থক, সরকারি সৈন্য এবং সব পক্ষের বেসামরিক লোকজনকে একই প্লাটফর্মে আনার কাজটি করা যায়নি। এমন পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো করে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন গঠন করে সমন্বয় সাধন করার। এই ব্যবস্থায় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা কমিশনে এসে তাদের বক্তব্য পেশ করবে, তারপর অপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়ার সুপারিশ করবে। কিন্তু সেটাও হয়নি।


২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা ও প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিঙ্গে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর অনেক সরকারি কর্মকর্তা সমন্বয় সাধনের বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। বিভিন্ন মহল থেকেই তা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল পর্যায় থেকে যেমনটা আশা করা হয়েছিল, তেমনভাবে করা হয়নি। তাছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় একটি সুদৃঢ় নীতির আলোকে উন্নয়ন কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়নি।


সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা বন্দনায়েকে কুমারাতুঙ্গার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য ও পুনর্মিলন (ওএনআরইউ) কার্যালয়ের সুচিত জাতীয় পুনর্মিলন ও সহ অবস্থান সংক্রান্ত নীতি হবার কথা রাষ্ট্রীয় নীতি। এটি সারা দেশে মন্ত্রণালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওসহ সব ধরনের স্টেকহোল্ডারের জন্য গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে। স্কুল পর্যায়ে সংঘাতের ব্যাপারে সচেতনতা প্রবর্তন এবং অন্য অনেক কিছুর পাশাপাশি স্কুল পাঠ্যক্রমের সাথে সংঘাত সংবেদনশীলতা সন্নিবেশ এ নীতির একটি উপাদান।


তবে এই নীতির বাস্তব কার্যকারিতা কি দাঁড়ায় সেটিই হবে দেখার বিষয়। বলা যায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রুখে দেওয়াটা নিশ্চিত করার জন্য শ্রীলঙ্কাকে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে বলেই মনে হচ্ছে।


সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

মন্তব্য

মতামত দিন

এশিয়া পাতার আরো খবর

মুসলিম হত্যার বিরুদ্ধে ভারত জুড়ে নাগরিক বিক্ষোভ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক আরটিএনএন দিল্লি: ভারতে একের পর এক মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বুধবার প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে সেদেশে . . . বিস্তারিত

দু’পক্ষে উত্তেজনায় সীমান্তে শক্তিবৃদ্ধি, ভারতের বিরুদ্ধে ‘অনুপ্রবেশের’ অভিযোগ চীনের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক আরটিএনএনবেইজিং: চীন-ভারতের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করেছে। এরই মধ্যে দু’দেশের মধ্যে ঘনঘটা বেজে উ . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গোলাম রসুল প্লাজা (তৃতীয় তলা), ৪০৪ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com