সর্বশেষ সংবাদ: |
  • পুনঃতফসিলের প্রজ্ঞাপন জারি করল নির্বাচন কমিশন
  • ঐক্যফ্রন্টের দাবির মুখে নির্বাচন পেছাল ইসি, নতুন সিডিউলে ৩০ ডিসেম্বর ভোট
  • সরকারের নির্দেশে নির্বাচন মাত্র এক সপ্তাহ পিছিয়েছে নির্বাচন কমিশন: রিজভী
  • যুক্তফ্রন্টের মহাজোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি: কাদের

সৌদির ভুয়া সংস্কারবাদ আন্দোলনের ইতিহাস ও ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান

০৭ নভেম্বর,২০১৮

সৌদির ভুয়া সংস্কাবাদ আন্দোনের ইতিহাস ও ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান

এডাম উইনস্টেইন: তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যাকারীরা সৌদি আরবের একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কাছে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছে।

আর এখন পশ্চিমারা তাদের নিজেদেরকেই প্রশ্ন করছে যে, কেন বিন সালমান তাদের নিকটে এত বেশি সুনাম অর্জন করেছিল? কোনো সৌদি শাসক নিজেকে বিশ্বের কাছে একজন সংস্কারক হিসেবে দাবী করার এটিই প্রথম বারের মত ঘটা কোনো ব্যাপার নয় এবং বিশ্ব তাদের এসব কার্যকলাপ দেখে বোকা বনে যাওয়ার মত ঘটনা এবারই প্রথম নয়।

চলতি বছরের মার্চ মাসে বার্তা সংস্থা সিভিএস’র সাংবাদিক ও’ডোনেল ক্রাউন প্রিন্স সালমানকে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি গত ৪০ বছরের সৌদি আরবের চিত্র পাল্টাতে পারবেন কিনা? এর উত্তরে বিন সালমান বলেছিলেন, ‘আমি আপনার দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- আপনারা আপনাদের স্মার্ট ফোনের মাধ্যমেই তা যাচাই করে দেখুন। তারা গুগুলে সার্চ দিয়ে ১৯৭০ এবং ১৯৬০ সালের সৌদি আরবের চিত্র দেখুক, তারা সহজেই পরিবর্তন আঁচ পারবে।’

বার্তা সংস্থা আটলান্টিকের সাংবাদিক জেফরি গোল্ডবার্গকে দেয়া আরেকটি সাক্ষাতকারে বিন সালমান বলেছিলেন, ‘১৯৭৯ সাল থেকে সৌদি আরবে অভিভাবকত্ব আইন চলমান ছিল কিন্তু এখন আর তা নেই। ১৯৬০ সাল থেকে সৌদির নারীগণ ঘর থেকে বাহিরে যেতে একজন পুরুষ সদস্যকে সাথে রাখতে হয়, কিন্তু এখন আর তা নেই।’

সমস্যা হচ্ছে- সৌদি শাসকদের বলা এসকল গল্প আসলে এক প্রকার মিথ (পুরানে বর্ণিত কাহিনী) এবং তারা এসকল মিথের ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবসময় কূটনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক সমর্থন আদায় করেছিল।

সৌদি শাসকেরা যুগের পর যুগ তার রাজতান্ত্রিক ধারা বজায় রেখেছে এবং তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইয়েমেনসহ আরো অন্যান্য অঞ্চলে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে তারা সংস্কারের নাম করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করছে।

সম্প্রতি সাংবাদিক খাসোগি হত্যাকাণ্ড সৌদি স্বৈরতন্ত্রের অতীত থেকে চলমান ধারার একটি উদাহরণ মাত্র এবং তাদের নিকট থেকে ভিন্ন কিছু আশা করার কোনো কারণ নেই।

১৯৬১ সালে যখন জন এফ কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, তখন ওয়াশিংটনে সৌদি বাদশা সৌদ এর খুব বেশি সুনাম ছিল এবং তাকে একজন সাদাসিধে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হত।

সৌদের পিতা তাকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিল –‘তুমি তোমার লোকজন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছ। অবাঞ্ছিত ব্যবহার ত্যাগ কর। সাধারণভাবে বাঁচতে শিখ, যাতে করে রাজতন্ত্র ভালো চলতে পারে।’

কিন্তু সৌদ তার পিতার পরামর্শ গ্রহণ করেন নি, বরং দেশজুড়ে বিভিন্ন বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে হাত দেন এবং এতে করেই তিনি তার বৈমাত্রেয় ভাই ফয়সালের সান্নিধ্যে আসেন যিনি আবার ওসামা বিন লাদেনের পিতার অন্যতম ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। ওসামা বিন লাদেনের পিতা সে সময় সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় নির্মাণ কোম্পানির মালিক ছিলেন।

১৯৬০ এর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস প্রিন্স ফয়সালের সাথে খুব বেশি সখ্যতা গড়ে তুলেছিল। বর্তমানের বিন সালমানের মতই সে সময় প্রিন্স ফয়সাল সৌদির পররাষ্ট্র নীতির প্রায় সবটুকুই ঠিক করে দিতেন এবং পরবর্তী দুবছরের মধ্যেই সৌদকে তার রাজতান্ত্রিক অধিকার থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন।

নতুন বাদশা ফয়সাল কেনেডি প্রশাসনের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন, বিশেষত উত্তর ইয়েমেনের গৃহ যুদ্ধে সৌদি আরবের জড়িয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে যেখানে মিশর এবং সৌদি আরব ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা রেখে চলছিল।

এর পরিবর্তে কেনেডি প্রশাসন সৌদি আরবে সংস্কার দেখতে চেয়েছিল বিশেষত সৌদি আরব থেকে দাস প্রথা তুলে দেয়ার জন্য। যদিও ১৯৬২ সালে বাদশা সৌদ এক রাজ আদেশে দাস প্রথা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রাউন প্রিন্স ফয়সাল সে সময় কেনেডি প্রশাসনকে এ কথা বোঝাতে সক্ষম হয় যে, তিনি আরো বেশী সংস্কার করতে সক্ষম।

পরবর্তীতে বাদশা ফয়সাল সৌদি আরবে বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে আসেন যা সৌদির ধর্মীয় আবরণকে কিছুটা হলেও পরিবর্তন করেছিল কিন্তু তা উন্নতির জন্য যথেষ্ট ছিলনা।

বাদশা ফয়সাল সৌদি আরবের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এর পূর্বে ১৯৪০ সালের দিকে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্না সৌদি আরবের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সৌদি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা তখনকার সৌদি বাদশা আব্দুল আজিজ তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

তবে ১৯৬০ এবং ১৯৭০ সালের মধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুড সৌদি আরবে তাদের শিক্ষা বিস্তার করতে সক্ষম হয় এবং তারা সৌদির বিদ্যালয় গুলোকে উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালায়।

আবার এদিকে আবদেল রাহমান যিনি পশ্চিমা বিশ্বে ‘অন্ধ শেখ’ নামে পরিচিত এবং তাকে পশ্চিমারা মুসলিম ব্রাদারহুডের চাইতেও বেশী হুমকি বলে মনে করত। এই আবদেল রাহমান ১৯৭০ সালে সৌদি আরবে আসেন এবং সেখানকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষা দান করা শুরু করেন।

পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে আবদেল রাহমানের নেতৃত্বে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদত কে হত্যা করা হয় এবং ১৯৯৩ সালে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র বোমা হামলা চালানো হয়।

১৯৭০ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা গণ বাদশা ফয়সাল কে সৌদি আরবে নতুন জাতীয় শিক্ষা পদ্ধতি নির্ধারণ করতে যথেষ্ট সহায়তা করে। সৌদি আরবের ইসলামি আন্দোলন সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ স্টিফেন লাক্ররিক্সের মতে –‘এমন ভাবে ইসলামের ধারণা সমূহ সৌদি বিদ্যালয় গুলোতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যা দেশটির শিক্ষার্থীদের কে ওহাবিজম এর চাইতেই মুসলিম ব্রাদারহুডের শিক্ষার দিকে বেশী ধাবিত করেছিল।’

এভাবেই মুসলিম ব্রাদারহুড সৌদি আরবে ইসলামি আন্দোলনের বীজ বপন করেছিল এবং এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি নাগরিক গণ অতি মাত্রায় আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর এভাবেই পরবর্তীতে ওসামা বিন লাদেনের মত নেতা তৈরী হয়।

বর্তমানে ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান সৌদি রাজতন্ত্রের সাথে মুসলিম ব্রাদারহুডের ইতিহাসকে পেছনে পেলতে যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন এবং একই সাথে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল ইসলামি দলসমূহ থেকে সমর্থন তুলে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

বার্তা সংস্থা দ্যা আটলান্টিকের সাংবাদিক গোল্ডবার্গকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বিন সালমান বলেন- ‘যদি আমরা অতীতে ফিরে যাই তবে আমরা একই বিষয় দেখতে পাবো। পরবর্তীতে আমরা দেখবো কিভাবে আমরা মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে আচরণ করেছিলাম। মনে রাখতে হবে যে, একসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এসব লোকজনদের স্বাধীনতাকামী যোদ্ধা বলে ঘোষণা করেছিলেন।’

‘আমরা তাদের আন্দোলনকে দমানোর জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম। কিন্তু এর পরেই আসল ১৯৭৯ সাল যা সবকিছুকে চুরমার করে দিয়েছিল। ইরানে বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল- যা একটি অঞ্চল ভিত্তিক একেবারে বিশুদ্ধ শয়তানী আদর্শকে লালন করে।’

ক্রাউন প্রিন্স সালমান হয়ত সৌদির সংশোধন-বাদী ইতিহাস এমন একটি রাজতন্ত্রের নিকটে বিক্রয় করতে চান যাদের অধিকাংশেরই জন্ম ১৯৭৯ সালের পরে কিন্তু এ মুহূর্তে ওয়াশিংটনকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি আবার পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। ইয়েমেনের সম্প্রতি যুদ্ধ এবং সাংবাদিক খাসোগি হত্যাকাণ্ড পুনরায় একটি সুযোগ নিয়ে এসেছে যাতে করে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি সম্পর্কে এসব ভুল ধারণার অবসান ঘটাতে পারে আর সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের ভুয়া সম্পর্ককে বিবেচনায় নিতে পারে।

সৌদি আরবে ব্যাপক ধরপাকড় এবং খাসোগি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আবার একটি যুগ-সন্ধিক্ষণ এসেছে যাতে করে সৌদির এসব কপট সংস্কারমূলক ত্রুটি দূর করা যায়।

সূত্রঃ ফরেইন ফলিসি ডট কমে প্রকাশিত হওয়া দক্ষিণ এশিয়া এবং ইরান বিষয়ক গবেষক এডাম উইনস্টেইনের কলাম থেকে।

মন্তব্য

মতামত দিন

ইউরোপ পাতার আরো খবর

বিজ্ঞানীর ছবি থাকবে ব্রিটেনের নতুন ব্যাংক নোটে

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনলন্ডন: যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড, ঘোষণা দিয়েছে নতুন ৫০ পাউন্ডের নোটে . . . বিস্তারিত

সৌদির কাছে আর অস্ত্র বিক্রি করবে না নরওয়ের

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনঅসলো: সৌদি আরবে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নরওয়ে। সম্প্রতি দেশটিতে চলমান পরিস্ . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com