ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞের ১০ বছর

শুধু দেখেছি আমার চারিদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত: ৪৮জন স্বজন হারানো নারী জয়নাব

১০ জানুয়ারি,২০১৯

৪৮জন স্বজন হারানো নারী জয়নাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আরটিএনএন
গাজা: যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরতা ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে আছে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর ও ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে পরিচালিত ‘অপারেশন কাস্ট লেড’। এই অভিযানে ইসরাইলি বাহিনী গাজা শহরের জাইতুন অঞ্চলে আল-সামোনি পরিবারের ৪৮ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।

গত ৫ জানুয়ারী ২০১৯ এই হত্যকাণ্ডের ১০ বছর পূর্ণ হলো। এই হত্যাযজ্ঞের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সামোনি পরিবারের জীবিত সদস্যরা মিলিত হয়েছিল গাজা শহরে। তাদের কথায় উঠে এসেছিল সেই ভয়াবহ মুহূর্তগুলোর বিষাদে ভরা বিবরণ।

সামোনি পরিবারের সদস্যরা বলছিল, ‘বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয় স্বজনদের চোখের সামনে হত্যার সেই ভয়াবহতা আমরা কাটিয়ে উঠেছি। কিন্তু সেই ভয়াবহতা কখনোই ভুলতে পারিনি, মন থেকে মুছে ফেলতে পারিনি।’

‘অপারেশন কাস্ট লেড’ ও ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ
২০০৯ সালে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন কাস্ট লেড’ নামে সর্বাত্মক সামরিক আগ্রাসন চালায় ইসরাইল। হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজায় এই আগ্রাসনের তীব্রতা ছিলো সবচেয়ে মারাত্মক। তিন সপ্তাহ স্থায়ী এই অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৪শ সাধারণ ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হন। তাদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলো বেসামরিক নাগরিক।

ঐ সময় গাজায় ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে মর্মান্তিক শিকার হয় সামোনি পরিবার। ইসরাইলি হামলায় এক সঙ্গে এই পরিবারের ৪৮ সদস্য নিহত হয়, যাদের মধ্যে ১০টি শিশু ও ৭ জন মহিলা ছিল।

হামলার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ইসরাইলি সেনারা প্রথমে জোরপূর্বক একটি ভবনে প্রায় ১শ বেসামরিক ফিলিস্তিনিকে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলো নারী ও শিশু। এ সময় তাদেরকে বাইরে বের না হওয়ার জন্য হুমকি দেয় ইসরাইলি সেনারা।

হত্যাযজ্ঞের আগের দিন (৪ জানুয়ারী, ২০০৯)
২০০৯ সালের ৪ জানুয়ারি সকালে গাজা শহরের দক্ষিণ অংশের জাইতুন অঞ্চলে তালাল হিলমি আল-সামোনির বাসভবনের তৃতীয় তলায় ইসরাইলি বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালে তালাল হিলমির পরিবারের ১৬ জন সদস্য ভবনটির নীচ তলায় আশ্রয় নেন।

ফিলিস্তিনের অধিকার সংস্থা আল-হক জানায়, ভয়াবহ বোমাবর্ষণের মধ্যে সেখানে আরও ৩টি সামোনি পরিবার এসে জড়ো হয়। তাদের ইব্রাহীম আল-সামোনি পরিবারের ১২ সদস্য, রাশেদ আল-সামোনি পরিবারের ১১ সদস্য এবং নাফিজ আল-সামোনি পরিবারের ১০ সদস্য আশ্রয় নেয় সেখানে।

তারপর ঐদিনই ইসরাইলি বাহিনী এসব পরিবারের সব সদস্যকে অন্য একটি ভবনে আশ্রয় নেয়ার আদেশ দেয়। যেটা ছিল ওয়ায়েল আল-সামোনির বাসভবন। ওয়ায়েলের পরিবারের ১১ সদস্য সেখানে ছিল।

সর্বমোট সামোনি পরিবারের ৬০জন সদস্যকে তারা ওয়ায়েলের ভবনে একই ছাদের নীচে জড়ো করেছিল, যেখানে ছিল না কোন পানি বা বৈদ্যুতিক সংযোগ। ২০০৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর অপারেশন কাস্ট লেডের নামে তারা আগেই সকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

ইসরাইলি বাহিনী সৈন্য ও ট্যাংক দিয়ে ওয়ায়েলের ভবনটিকে ঘেরাও করে রেখেছিল।

হত্যাযজ্ঞের দিন (৫ জানুয়ারী, ২০০৯)
পরদিন, ৫ জানুয়ারী গোলাগুলি কিছুটা বন্ধ হয়েছে মনে করে আবদ্ধ-তৃষ্ণার্ত-ক্ষুধার্ত সামোনি পরিবারের এক সদস্য পানি আনার জন্য বের হতে গিয়ে দেখে ইসরাইলি বাহিনী এখনো তাদের ভবনটিকে ঘেরাও করে রেখেছে। সে তখন আতঙ্কিত হয়ে ফিরে যায়।

এর পাঁচ মিনিটের মধ্যে ইসরাইলিরা ভবনটিকে লক্ষ্য করে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে, যাতে ৭জন গুরুতর আহত হয়। বর্ণনা দিয়েছিল আল-হক।

এর তিন মিনিটের মধ্যে খুব কাছ থেকে আরেকটি মিসাইল নিক্ষেপ করে তারা, যার ফলে ভবনটিতে আবদ্ধ সামোনি পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই নির্মমভাবে নিহত হয়। বিশেষ করে শিশু এবং নারীরা বেঘোরে প্রাণ হারায়।

পরবর্তীতে সামোনি পরিবারের গুরুতর আহত ২২জন সদস্য সাদা পতাকা উত্তোলন করে ৪টি মৃতদেহ সাথে নিয়ে ভবনটি থেকে বের হতে পারে।

ইসরাইলিরা তখন তাদের উদ্দেশ্যে সরাসরি গুলি করতে থাকে। কিন্তু সামোনি পরিবারের আহত সদস্যরা বাঁচার জন্য ছুটতে থাকে। এক সময় একটা এম্বুলেন্স এসে তাদেরকে উদ্ধার করে। এর আগেই ইসরাইলি বাহিনী জায়তুন অঞ্চলে সকল প্রকার চিকিৎসা ও এ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ করে দিয়েছিল।

৩ দিন পর যখন রেডক্রসের সদস্যরা ঐ ভবনটিতে প্রবেশের অনুমতি পায় তখন ইসরাইলি বর্বরতার এ এক জঘন্য দৃশ্য দেখতে পায় তারা। রেডক্রসের সদস্যরা সেখানে গুরুতর আহত আট শিশুসহ ১৩জনকে উদ্ধার করে। যারা দীর্ঘদিন কোন পানি বা খাদ্যেরও দেখা পায়নি। তারা তাদের পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের লাশের নীচে চাপা পড়ে ছিল।

৫ জানুয়ারী, ২০০৯ তারিখে গাজায় ইসরাইলি বাহিনী কর্তৃক নিহত আল সামোনি পরিবারের সদস্যের একটি পোস্টার। ছবি: মারাম হুমায়দ / আল জাজিরা

এই হত্যাযজ্ঞে আল-সামোনি পরিবারের সর্বমোট ৪৮ সদস্য নিহত হয়। যাদের মধ্যে ছিল ১০জন শিশু ও ৭জন মহিলা।

এই ঘটনায় বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপে ও বিশ্বব্যাপী নিন্দার মুখে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

কিন্তু ঘটনার ৩ বছর পর ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ২০১২ সালে তদন্ত বন্ধের ঘোষণা দেয়। ইতিহাসের জঘন্য মিথ্যাচার করে তারা জানায়, ইসরাইলি হামলায় নিহত এই ৪৮ জনের মৃত্যু যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। ওই ভবনটি এবং এতে আশ্রয় নেওয়াদের ওপর ইসরাইলি বাহিনী ভুলক্রমে হামলা চালিয়েছিল।

‘কখনোই ভুলতে পারি না’
ঐ ঘটনায় জীবিত সামোনি পরিবারের সদস্য জয়নাব আল-সামোনি। সেই ভয়াবহ হত্যযজ্ঞের সময় জয়নাবের বয়স ছিল ১২।

ঘটনার কথা স্মরণ করে জয়নাব বলেন, ‘সময় কখনোই আমার মনের দগদগে ক্ষত মুছে দিতে পারবে না। আমার চোখের সামনে আমার পিতা-মাতাকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। আমার আহত স্বজনদের অনেকেরই মৃত্যু হয়েছিল যখন ইসরাইলিরা তাদেরকে হাসপাতালে নিতে দেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই ভুলবো না। আমি আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, চাচাতো ভাই-বোন ও চাচা-চাচীদের হারিয়েছি। যাদেরকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে।’

‘সেদিন তীব্র ঠান্ডা ছিল। শিশুদেরকে গায়ে দেয়ার মত কোনো কম্বল ছিল না। না ছিল মুখে দেয়ার মত কোনো খাবার’, জয়নাব স্মরণ করেন।

জয়নাব বলে যান, ২০০৯ সালের জানুয়ারির পাঁচ তারিখে আমরা যে ভবনটিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সেই ভবনটি প্রায় ৬টি মিসাইল দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়। ধুলা আর ধোয়ার জন্য আমি কিছুই দেখছিলাম না। শুধু দেখেছি আমার চারিদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত।

তিনি বলেন, আমার ১৭ বছরের ভাইটি হারিয়ে গিয়েছিল।

‘পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষে আমরা তার দেহকে আমাদের ঘরের ধ্বংসস্তুপের নীচে খুঁজে পেয়েছিলাম, যেটা ইসরাইলিরা বুলডেজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছিল। আমার ভাইয়ের হাত পেছন থেকে হ্যান্ডকাপ লাগানো ছিল। তারা তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করেছিল’, জয়নাব বর্ণনা দেন।

জয়নাবের সবচেয়ে ছোট বোন ছিল ২ বছর বয়সী। জয়নাব বলেন, আমি ছোট হলেও আমি তার দেখাশুনা করতাম।

গাজা শহরে তিন সন্তানের সাথে জয়নাব আল-সামোনি। ছবি: মারাম হুমায়দ / আল জাজিরা

জয়নাব জানান, ‘আমার প্রতিটি সুখে এবং দুঃখে্ আমার বাবা-মাকে অনুভব করি। আমার বাগদানের দিন, বিবাহের দিন এবং আমি যেদিন সন্তান প্রসব করেছি সেদিনগুলোতে আমি আমার মায়ের হাতকে খুব অনুভব করেছি। তিনি যদি আমার হাতটা ধরতেন, আমার সন্তানদেরকে জড়িয়ে নিতেন!’

জয়নাবের বয়স এখন ২২। তিনি এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জননী। প্রতি বছর ৫ জানুয়ারি তিনি খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেন এবং তার কক্ষে সময় কাটান। আর সেই মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞের স্মৃতিচারণ করে কাঁদেন।

তিনি বলেন, ‘আমি ডিসেম্বরকে ঘৃণা করি, ঘৃণা করি জানুয়ারিকে। এবং ঐ সবকিছুকে ঘৃণা করি যা আমাকে ঐ দিনগুলির কথা মনে করিয়ে দেয়।’

[আরটিএনএনের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ তানজীমুদ্দীন।]

মন্তব্য

মতামত দিন

মধ্যপ্রাচ্য পাতার আরো খবর

ইরানে ১৬ আরোহী নিয়ে কার্গো বিমান বিধ্বস্ত, ১৫জন নিহত

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনতেহরান: ইরানের রাজধানী তেহরানের কাছে একটি সামরিক কার্গো বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানটিতে থাকা ১ . . . বিস্তারিত

সৌদি নারী সালওয়ার কাহিনী: ‘যেভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলাম’

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনরিয়াদ: এটা এমনই এক নাটকীয় ঘটনা যার মধ্য দিয়ে সৌদি আরবে নারীদের সমস্যার ওপর নতুন করে বিশ্বের ন . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com