বাঘের থাবায় বিধ্বস্ত সিংহের ডেরা

১৯ মার্চ,২০১৭

খেলা ডেস্ক

আরটিএনএন

কলম্বো: এক কথায় অবিশ্বাস্য! নিজেদের শততম ম্যাচ স্মরণীয় করে রাখতে যা যা করার প্রয়োজন সবকিছুই করলো টাইগাররা। ফলশ্রুতিতে মিললো ঐতিহাসিক জয়। এই জয় একই সঙ্গে প্রতীকীও বটে। এর জন্য পি সারা ওভালের চেয়ে ভালো ভেন্যু আর হতে পারতো না। এই মাঠেই বাংলাদেশের রেকর্ড ছিল সবচেয়ে বাজে। দুঃস্বপ্নের ভেন্যুতে এবার দারুণ জয় পেল মুশফিকুর রহিমের দল।


নিজেদের সেঞ্চুরি ম্যাচ স্মরণীয় করে রাখলো টাইগাররা। অবশ্য এর আগে বাংলাদেশ তাদের শততম ওয়ানডেতেও জয়লাভ করে। সেই ম্যাচে জয়ের নায়ক ছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। ব্যাটে-বলে সমান দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেই বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়েছিলেন তিনি। ওয়ানডেতে এখনো বাংলাদেশের হয়ে খেলে গেলেও ইনজুরির আঘাতে লম্বা করতে পারেননি টেস্ট ক্যারিয়ারকে। তাই মাঠ না থাকতে পারলেও শততম টেস্টে প্লেয়ার্স লাউঞ্জে বসে সতীর্থদের উৎসাহ দিয়েছেন বাংলাদেশ দলের রঙিন জার্সির অধিনায়ক।


শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টেস্ট ম্যাচ জেতার গৌরব অর্জন করেছে টাইগাররা। ৪ উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয় মুশফিকের দল। ফলে, ১-১ সমতায় শেষ হলো দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ।


১৯১ রানে লক্ষ্যে খেলতে নেমে শুরুতে ধাক্কাই খেয়েছিলো বাংলাদেশ। শুরুর ধাক্কা কাটিয়ে উঠে তামিম-সাব্বিরের ব্যাটে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় টাইগাররা।


আবারো ব্যর্থ সৌম্য। ওপেনিংয়ে ভালো কিছু করতে পারলেন না সৌম্য সরকার। হেরাথের করা ইনিংসের নবম ওভারে পঞ্চম বলে থারাঙ্গার হাতে ক্যাচ হয়ে সাজঘরে ফেরেন সৌম্য। সাজঘরে ফেরার আগে ২৬ বলে ১০ রান আসে তার ব্যাট থেকে।


ব্যাক টু ব্যাক আঘাতে সৌম্যের পরের বলেই ইমরুল কায়েসকে ফেরালেন হেরাথ। হেরাথের করা ইনিংসের নবম ওভারের শেষ বলেই গুনারত্নের হাতে স্লিপে তালুবন্দি হয়ে ডাক মেরে সাজঘরে ফেরেন ইমরুল কায়েস।


সৌম্য ও ইমরুলের ব্যাক টু ব্যাক পতনের পর প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন তামিম ও সাব্বির। তাদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলীয় ফিফটি ছাড়িয়ে যায় বাংলাদেশ। আগ্রাসী এ দুই ব্যাটসম্যানের কাঁধে চড়ে বহুদূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলো বাংলাদেশ।


দলীয় ২২ রানেই দুই উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়েছিল বাংলাদেশ। তবে দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে সেই চাপ থেকে বাংলাদেশকে টেনে তুলেন তামিম। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তুলে নিয়েছেন ফিফটি। সান্দাকানের করা ইনিংসের ২৭তম ওভারের দ্বিতীয় বলেই ডাবলস নিয়ে ফিফটি পূরণ করেন তিনি। ২৮তম জন্মদিনের ঠিক একদিন আগে দেশকে বড় একটি উপহার দেন দেশসেরা এ ওপেনার। টেস্টে এটি তামিমের ২২তম ফিফটি। ৮৭ বল মোকাবেলায় ৩টি চারে ফিফটি পূরণ করেন তামিম।


হেরাথের বল ডাবলস নিয়ে সাব্বিরের সঙ্গে জুটির শতরান পূরণ করেন তামিম। তাদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে জয়ের সুবাস পাচ্ছিলো বাংলাদেশ। এ জুটিতে সেঞ্চুরি করতে তামিম ৭৬ এবং সৌম্য ৩৪ রান করেন।


পেরেরার বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে চান্দিমালের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান তামিম। যাওয়ার আগে ১২৫ বলে ৮২ রান করে যান।


এলবিডব্লিউর আবেদনে আম্পায়ার সাড়া না দেওয়ায় রিভিউ নেয় শ্রীলঙ্কা। তাতেই সর্বনাশ হয় সাব্বিরের। দিলরুয়ান পেরেরার করা ইনিংসের ৪১ তম ওভারের পঞ্চম বলে এলবিডব্লিউ হলে সাব্বিরের ৪১ রানের ইনিংসে ছেদ পড়ে।


দিলরুয়ান পেরেরার বল সাকিবের ব্যাট স্পর্শ করে স্টাম্পে আলতো চুমু এঁকে দেয়। বল উইকেটরক্ষকের পা ছোঁয়ার পর বেল পড়ে যায়। পড়ে টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় সাকিবের ব্যাট স্পর্শ করেই বল স্টাম্পে আঘাত করে। ফলে বোল্ড হয়ে ব্যক্তিগত ১৫ রানে সাজঘরে ফিরতে হয় সাকিবকে।


ইনিংসের ৫২ তম ওভারে পেরেরার বলে এলবিডব্লিউর আবেদন করলে আঙুল উঁচিয়ে আউটের সিগনাল দেন আম্পায়ার। কিন্তু রিভিউতে দেখা যায় বল অফ-ব্রেকে স্টামের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে বেঁচে যান মুশফিক।


শেষ মুহূর্তের টানটান উত্তেজনায় উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসতে হয় ধীর গতিতে ব্যাট করা মোসাদ্দেক হোসেনকেও। এরপরই ক্রিজে নেমে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন মেহেদী হাসান মিরাজ। হেরাথের ফুল টস বল শর্ট ফাইন লেগ অঞ্চলে ঠেলে দিয়ে দুই রান নিয়ে জয় নিশ্চিত করেন মিরাজ। আর তাতেই শততম টেস্টে শ্রীলঙ্কাকে ৪ উইকেটে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ।


বাংলাদেশের শততম টেস্টে মাঠে থাকতে মারতেন মাহমুদউল্লাহও। কিন্তু অসময়ে ব্যাট কথা বলা বন্ধ করে দিলে শেষ মুহূর্তে দল থেকে বাদ পড়তে হয় তাকে। তাই বলে এমন টেস্ট তাও আবার জয়ের পথে আছে বাংলাদেশ, সে ম্যাচে কি হোটেলে বসে থাকা যায়। তাই মাশরাফির সঙ্গে মাঠে বসে খেলা উপভোগ করতে চলে আসলেন তিনিও।


বাংলাদেশের এ ঐতিহাসিক ম্যাচে সঙ্গে এসেছেন ওয়ানডে দলের জন্য যোগ হওয়া বাকি তিন খেলোয়াড়। মাশরাফি-মাহমুদউল্লাহদের সঙ্গে বসে খেলা উপভোগ করেন নুরুল হাসান সোহান, শুভাগত হোম ও সানজামুল ইসলাম।


সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের চতুর্থ দিনটি বাংলাদেশের পক্ষেই ছিল। কেননা এদিন লঙ্কানরা নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ২১৪ রান তুলতে আট উইকেট হারায়। দিন শেষে মোট ২৬৮ রান করে। যেখানে লিড পায় ১৩৯ রানের। ওপেনার দিমুথ করুনারত্নের সেঞ্চুরিই (১২৬) তাদের রানের চাকা সচল রাখে। দিলরুয়ান পেরেরা (২৬) ও সুরাঙ্গা লাকমাল (১৬) অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন।


চতুর্থ দিন বাংলাদেশি বোলারদের মধ্যে দুর্দান্ত ভূমিকা রাখেন মোস্তাফিজুর রহমান ও সাকিব আল হাসান। দু’জনেই তিনটি করে উইকেট তুলে নিয়ে লঙ্কানদের দ্বিতীয় ইনিংসে ধস নামাতে সাহায্য করেন। মেহেদি হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম একটি করে উইকেট নেন।


এর আগে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা নিজেদের প্রথম ইনিংসে দিনেশ চান্দিমালের সেঞ্চুরিতে ৩৩৮ রান করতে সমর্থ হয়। জবাবে টাইগাররা দাপট দেখিয়ে ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করে। সাকিব আল হাসানের অসাধারণ সেঞ্চুরির সুবাদে ৪৬৭ রান করে হাতুরুসিংহের শিষ্যরা। ম্যাচে পায় ১২৯ রানের লিড।


শ্রীলঙ্কা প্রথম ইনিংস: ১১৩.৩ ওভার ৩৩৮ রান (দিমুথ করুনারাত্নে ৭, উপুল থারাঙ্গা ১১, কুশল মেন্ডিস ৫, দিনেশ চান্দিমাল ১৩৮, অসিলা গুনারাত্নে ১৩, ধনঞ্জয় ডি সিলভা ৩৪, নিরোশান ডিকওয়েলা ৩৪, দিলরুয়ান পেরেরা ৯, রঙ্গনা হেরাথ ২৫, সুরাঙ্গা লাকমাল ৩৫, লক্ষণ সান্দাকান ৫*; মোস্তাফিজুর রহমান ২/৫০, শুভাশিষ রায় ২/৫৩, মেহেদী হাসান মিরাজ ৩/৯০, তাইজুল ইসলাম ১/৪০, সাকিব আল হাসান ২/৮০, মোসাদ্দেক হোসেন ০/১১)।


বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ১৩৪.১ ওভার ৪৬৭ রান (তামিম ইকবাল ৪৯, সৌম্য সরকার ৬১, ইমরুল কায়েস ৩৪, সাব্বির রহমান ৪২, তাইজুল ইসলাম ০, সাকিব আল হাসান ১১৬, মুশফিকুর রহিম ৫২, মোসাদ্দেক হোসেন ৭৫, মেহেদী হাসান মিরাজ ২৪, মোস্তাফিজুর রহমান ০, শুভাশীষ রায় ০*; সুরাঙ্গা লাকমাল ২/৯০, দিলরুয়ান পেরেরা ০/১০০, রঙ্গনা হেরাথ ৪/৮২, অসিলা গুনারাত্নে ০/৩৮, লক্ষণ সান্দাকান ৪/১৪০, ধনঞ্জয় ডি সিলভা ০/৫)


শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় ইনিংস: ১১৩.২ ওভার ৩১৯ রান (দিমুথ করুনারাত্নে ১২৬, উপুল থারাঙ্গা ২৬, কুশল মেন্ডিস ৩৬, দিনেশ চান্দিমাল ৫, অসিলা গুনারাত্নে ৭, ধনঞ্জয় ডি সিলভা ০, নিরোশান ডিকওয়েলা ৫, দিলরুয়ান পেরেরা ৫০, রঙ্গনা হেরাথ ৯, সুরাঙ্গা লাকমাল ৪২, লক্ষণ সান্দাকান ০*; শুভাশিষ রায় ০/৩৬, মেহেদী হাসান মিরাজ ১/৭১, মোস্তাফিজুর রহমান ৩/৭৮, সাকিব আল হাসান ৪/৭৪, মোসাদ্দেক হোসেন ০/১০, তাইজুল ইসলাম ১/৩৮)


বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ৫৭.৫ ওভার ১৯১/৬ রান (তামিম ইকবাল ৮২, সৌম্য সরকার ১০, ইমরুল কায়েস ০, সাব্বির রহমান ৪১, সাকিব আল হাসান ১৫, মুশফিকুর রহিম ২২*, মোসাদ্দেক হোসেন ১৩, মেহেদী হাসান মিরাজ ২*; দিলরুয়ান পেরেরা ৩/৫৯, রঙ্গনা হেরাথ ৩/৭৫, ধনঞ্জয় ডি সিলভা ০/৭, লক্ষণ সান্দাকান ০/৩৪, সুরাঙ্গা লাকমল ০/৭, অসিলা গুনারাত্নে ০/৪)


ফলাফল: বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জয়ী

ম্যান অব দ্য ম্যাচ: তামিম ইকবাল (বাংলাদেশ)

ম্যান অব দ্য সিরিজ: সাকিব আল হাসান (বাংলাদেশ)

সিরিজ: দুই ম্যাচ সিরিজ ১-১ সমতা

টেস্ট ডেব্যু: মোসাদ্দেক হোসেন (বাংলাদেশ)

মন্তব্য

মতামত দিন

ক্রিকেট পাতার আরো খবর

গ্রামে নিষিদ্ধ ছিলেন ফখর জামান!

খেলা ডেস্কআরটিএনএনইসলামাবাদ: ক্রিকেটটা যে আগে ভালো খেলতেন না এমন নয়, তবে কখনো পেশা হিসেবে ভাবতেন না পাকিস্তানের চ্যাম্পি . . . বিস্তারিত

বাংলাদেশের মেয়ে ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপে নেই কেন?

খেলা ডেস্কআরটিএনএনঢাকা: নারীদের একদিনের বিশ্বকাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে ইংল্যান্ডে। এবারের বিশ্বকাপে . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গোলাম রসুল প্লাজা (তৃতীয় তলা), ৪০৪ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com