ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষায় ১ম হওয়া সাইয়েদ আব্দুল্লাহর গল্প

২৮ নভেম্বর,২০১৭

সায়েদ আব্দুল্লাহ

নিউজ ডেস্ক
আরটিএনএন
ঢাকা: সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া অসাধারণ মেধাবী ছাত্র সাইয়েদ আব্দুল্লাহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারে ২০১৭-২০১৮ সেশনের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার এই কৃতি সন্তান।

পাবনা ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচ এসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছেন এবার। নিজের জীবনের গল্প শুনিয়েছেন সাইয়েদ আব্দুল্লাহ। আবদুল্লাহ’র কথোপকোথন তুলে ধরা হলো।

প্রশ্নঃ কেমন আছো?
উত্তরঃ আলহামদুলিল্লাহ। বেশ ভাল আছি।

প্রশ্নঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তুমি প্রথম হয়েছো। এই বিষয়ে যাঁদের অভিজ্ঞতা আছে শুধু তাঁরাই জানেন এটা কত বড় অর্জন । তোমার মেধা নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় নিউজ হয়েছে | তুমি কি মেধা নিয়েই জন্মেছো নাকি দিনে দিনে নিজেকে মেধাবী হিসেবে গড়ে তুলেছো?

উত্তরঃ আমার কাছে মনে হয় মেধা জিনিসটা ঠিক প্রাপ্তির নয়, চর্চার ব্যাপার। চর্চার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

প্রশ্নঃ তোমার জন্ম খুব সাধারণ একটি পরিবারে ।বাংলাদেশের অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তির সংগে তোমার শৈশব মিলে যাচ্ছে । অনেক বিত্তবান বাবা মা সন্তানের পিছনে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেও সন্তানকে মানুষ করতে পারছেননা । সমস্যাটা কোথায় আসলে?

উত্তরঃ আমার মতে সমস্যাটা হল দৃষ্টিভঙ্গির। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিত্তবান ঘরের সন্তানেরা ভাবে যে পড়ালেখার যোগ্যতা খানিকটা কম হলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তারা বংশীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে ঠিকই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, যা প্রকৃতপক্ষে সবসময় সঠিক হয় না। কিন্তু একবার যখন লাইনচ্যূত হয়ে যায়, তারা আর সঠিক পথে আসতে পারে না ।

প্রশ্নঃ ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলে তুমি । ছাত্র হিসেবে এটাও অনেক বড় একটা অর্জন। বড় হওয়ার স্বপ্ন নিজেই দেখেছো নাকি জীবনের বিশেষ কোনো ঘটনা তোমাকে বড় হতে অনুপ্রাণিত করেছে?

উত্তরঃ ক্যাডেট কলেজে চান্স পাওয়াটা নিঃসন্দেহে আমার জন্য একটি বড় আশীর্বাদ ছিল। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি পারিপার্শ্বিক অবস্থা কোন মানুষকে বড় কোন স্বপ্ন দেখতে অনেক বেশি প্রভাবিত করে। ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়ে অধিকাংশ ব্যক্তিই সমাজের বেশ বড় বড় জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাদেরকে দেখে অনুপ্রাণিত হই আমি। পাশাপাশি নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয়ও নিজের ভেতর থাকা উচিৎ। এই চেতনাবোধ সম্পূর্ণরূপে নিজের ব্যক্তিসত্তার ওপর নির্ভর করে।

প্রশ্নঃ স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষর্থী অকালে "নষ্ট" হয়ে যাচ্ছে । এর পিছনে অবশই কারণ আছে । কিছু বিষয় বলো যেগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকা দরকার ।

উত্তরঃ আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আমরা শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভাল মার্ক পাওয়ার জন্য পড়ালেখা করি । একটি বিষয়কে গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করা থেকে আমরা দূরে চলে যাচ্ছি, যা মোটেই শুভকর নয়। পাশাপাশি পাঠ্যবই এর চেয়ে গাইড বইগুলোতে আমাদের আগ্রহ যেমন বেশি, তেমনি ক্লাসের পড়ার চেয়ে প্রাইভেট -কোচিং এর প্রতি গুরুত্ব বেশি দেই। অবশ্য এই বিষয়গুলোতে শুধুমাত্র যে আমরাই পশ্চাদপসরণ করছি, এমনটি নয়। আমাদের দেশের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থাও এর পেছনে সমভাবে দায়ী ।

প্রশ্নঃ দুটো বিষয় বর্তমান শিক্ষার্থীদের খুবই প্রভাবিত করে - ফেইসবুক এবং রিলেশনশিপ । এই ব্যাপারে কি করণীয় হতে পারে?

উত্তরঃ অন্যান্য সবকিছুর মত ফেইসবুক এর ভাল এবং খারাপ উভয় দিকই রয়েছে। সমস্যাটা হল অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এই ফেইসবুককে কার্যকরীভাবে ব্যবহার করে না। বরং তারা এটাকে নিছক আড্ডাবাজির জন্য ব্যবহার করে। অথচ ইচ্ছা করলেই এই ফেইসবুকই কিন্তু হতে পারে শিক্ষার মাধ্যম। এটার মাধ্যমে বিভিন্ন লাইভ ক্লাসে তারা অংশগ্রহণ করতে পারে,পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষামূলক পেইজ থেকে তারা শিক্ষণীয় ব্যাপারগুলো শিখতে পারে। কিন্তু তারা যখন এই ফেইসবুক কে শুধুমাত্র আড্ডাবাজির জন্য ব্যবহার করছে তখন তা হয়ে যাচ্ছে আমাদের পড়ালেখার এক নম্বর শত্রু।

আর যখন যে কাজ করা উচিৎ, তার আগে সেই কাজকরা কখনই ভাল কিছু বয়ে নিয়ে আসতে পারে না। একটি রিলেশন ঠিক রাখতে গেলেও বেশ কিছু পারস্পারিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। আর পড়ালেখা হল একটি মহান সাধনা। এই সাধনার পাশাপাশি অন্য দিকে দৃষ্টি দিলে তখন মন্দের দিকটাই বেশি প্রতীয়মান হয়।

প্রশ্নঃ একটি বিষয়ে তোমার সঙ্গে আমার মিল আছে। আমি আইনজীবী আর তুমি আইনের ছাত্র। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছো, সামনে তো অনেক অপসন খোলা ছিলো। আইন পড়তে চাইছো কেন ?

উত্তরঃ প্রকৃতপক্ষে একেবারে ব্যক্তিগত পছন্দের জন্যই আইন নিয়ে পড়তে শুরু করেছি। দেশ এবং দেশের বাইরে যাদেরকে আমি আইকন হিসাবে মানি, তারা সবাই ছিলেন আইনের ছাত্র। আর সবচেয়ে বড় কথা পেশাগত দিক চিন্তা করলে আইন সংক্রান্ত পেশাগুলো অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং এবং চ্যালেঞ্জিং কোন কিছু সবসময়ই আমাকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করে।

প্রশ্নঃ বাবা মায়ের তখনি সার্থকতা যখন সন্তান তাঁদের চেয়েও বড় হয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায় গরিব বাবা মা না খেয়ে সন্তান মানুষ করেন কিন্তু সন্তান "অমানুষ" হয়ে বাবা মা অস্বীকার করে । ব্যাপারটা কষ্টের। কি বলো ?

উত্তরঃ ব্যাপারটা অনেক বেশি দুঃখজনক। প্রকৃতপক্ষে সন্তান যত বড়ই শিক্ষিত হোন না কেন,অভিজ্ঞতায় তারা কোনদিনও তাদের পিতাপাতার সমান হতে পারেন না। কারণ, এই দুনিয়ার বুকে তারা সন্তানের চেয়েও বেশি দিন অতিবাহিত করছেন। খেয়াল করলে দেখবেন পড়ালেখার মূল উদ্দেশ্য হল আমাদের মানবিকতাকে জাগ্রত করা। যিনি পড়ালেখা করার পরেও মানবিকতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন, বুঝতে হবে তিনি প্রকৃতপক্ষে শিক্ষিত হতে পারেন নি।

প্রশ্নঃ যারা তোমার মতো "ভালো ছাত্র" হতে চায় তাদের কিছু পরামর্শ দাও।

উত্তরঃ আমি সবমসময়ই যে কথাটি বলি, ভাল একজন ছাত্র হতে হলে সবচেয়ে আগে যে কাজটি করা উচিৎ তা হল স্বকীয়তা অর্জন করা। কাউকে হুবহু নকল করে কখনও কেউ বড় হতে পারে না। আর পড়ালেখার পূর্বশর্ত হল একটি রুটিন মাফিক পড়ালেখা করা। কে কত ঘণ্টা পড়ছে, সেটা বড় কথা নয়। বরং কতটা কার্যকরীভাবে পড়ছে সেটাই বড় কথা। পড়ালেখার পাশাপাশি অবশ্যই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করা উচিৎ। সুযোগ পেলে সামাজিক কাজেও অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করা উচিৎ। পৃথিবীজুড়ে কী কী ঘটছে সেগুলোর দিকে নজর রাখাও একান্ত কর্তব্য। আর প্রযুক্তির কল্যাণে এখন এসব কাজ খুবই সহজ। ভাল কিছু গল্পের বই সবসময়ই নিজের সাথে রাখতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়।

প্রশ্নঃ প্রচলিত ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে তোমার কি মতামত ?

উত্তরঃ আমি ছাত্র রাজনীতির পক্ষে।তবে তা হবে শুধুমাত্র ভার্সিটি লেভেলে এসে, তার আগে কখনই নয়। বর্তমান সময়ে ছাত্ররাজনীতির নামে যে অস্থিরতা বিরাজমান, চরমভাবে আমি তার বিরোধী। একজন ছাত্রের প্রধান ব্রত হওয়া উচিৎ লেখাপড়া করা। পাশাপাশি সময় বের করতে পারলে তখন খানিকটা রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া যায়। কিন্তু এখন দেখা যায় উলটো চিত্র। যারা ছাত্র রাজনীতি করে, তাদের যেন মনে হয় প্রধান ব্রত হয়ে গেছে অসুস্থ রাজনীতি, আর পড়ালেখা হয়ে গেছে গৌণ বিষয়। যা কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আলাপচারিতায় সময় দিয়েছো, এজন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আপনি সময় করে বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করেন, এটা আমাদের অনেকের জন্য আদর্শ হতে পারে ।

সায়েদ আব্দুল্লাহর সাথে কথা বলা ব্যারিষ্টার মোস্তাক আহমেদের ফেসবুক থেকে নেয়া ।

মন্তব্য

মতামত দিন

উচ্চ শিক্ষা পাতার আরো খবর

শিক্ষায় ক্যাডার, নন-ক্যাডার প্রশ্নে বিরোধ তুঙ্গে

নিউজ ডেস্কআরটিএনএনঢাকা: বেসরকারি কলেজ সরকারি করার পর, সেখানকার শিক্ষকরা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হবেন কিনা, তা . . . বিস্তারিত

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক গবেষণা কতটা হচ্ছে?

নিউজ ডেস্কআটিএনএনঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ইন্সটিটিউট। এই ইন্সটিটিউটের একজন শিক্ষক তৌহিদুল হক। গত তিন বছর . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com