রাবির ভিসি-প্রোভিসি পদ নিয়ে আ.লীগপন্থী শিক্ষকদের ঘুম হারাম

১৭ মার্চ,২০১৭

নিজস্ব প্রতিনিধি
আরটিএনএন
রাজশাহী: বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণের মেয়াদ চার বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামী ১৯ মার্চ। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য (রাষ্ট্রপতি) নতুন উপাচার্য, উপ-উপাচার্যকে পরবর্তী চার বছরের জন্য দায়িত্ব দেবেন। এ দায়িত্ব পেতে এরই মধ্যে দৌঁড়ঝাপ ও লবিং শুরু করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক। এতে অনেকেরই ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

জানা যাচ্ছে, শিক্ষা ও গবেষণায় মান উন্নয়ন, নেতৃত্বদানের ক্ষমতা এবং দলীয় যোগ্যতায় যারা বেশি এগিয়ে সর্বশেষ হয়তো তারাই পাবেন বিশ্ববিদ্যালয় উপচার্য-উপ-উপচার্যের গুরুত্বপূর্ণ এ দুইটি পদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই পদ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন। কে হচ্ছেন রাবির পরবর্তী উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য, বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে শুরু হয়েছে নানা কৌতুহল।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ-১৯৭৩ অনুযায়ী দেশের শীর্ষ চার বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়। এ অধ্যাদেশের ১১(২) ধারা অনুযায়ী, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য (রাষ্ট্রপতি) সিনেট মনোনীত তিনজনের একটি প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেন।’

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এরই মধ্যে বিভিন্ন বিভাগের অন্ত্যত ৯ জন অধ্যাপক উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে পরবর্তী প্রশাসনে দায়িত্ব পেতে বিভিন্ন মহলের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এই অধ্যাপকরা এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক একজন উপাচার্যও নতুন করে আবারও সেই পদটি নিতে চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেয় ২০১২ সালের ২০ মার্চ। তাদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২০ মার্চ। এরপর পরবর্তী চার বছরের জন্য পুনরায় বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দিন ও উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহান আবারো একই পদে থাকতে পারেন। তাদের দায়িত্বে গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় সার্বিকভাবে যে উন্নতি হয়েছে তা এরইমধ্যে সরকারের নজর কেড়েছে। তাই বর্তমান সরকার হঠাৎ করে নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে নাও পারেন।

অনেকেই মনে করছেন, ‘বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা, গবেষণাসহ নানা বিষয়ের উন্নয়ন কর্মকান্ডে এই প্রশাসন খুবই সফলতা দেখিয়েছে। এই প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাণিজ্য,  টেন্ডার থেকে ই-টেন্ডার এমনকি শিক্ষক নিয়োগেও অনেকাংশে স্বচ্ছতা নিয়ে এসেছে।

নতুন ভিসি, প্রো-ভিসি সম্পর্কে প্রত্যাশা জানতে চাইলে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুসতাক আহমেদ বলেন, ‘উপাচার্য, উপ-উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতার প্রাধান্য পরিহার করা উচিত। এছাড়া আদর্শ ও প্রগতিশীলতার চর্চা বজায় রেখে যারা প্রতিক্রিয়াশীলদের সঙ্গে আপোস করবে না, তাদেরকেই দায়িত্ব দেয়া উচিত। বর্তমান প্রশাসন সম্পর্কে তিনি বলেন, এই প্রশাসন উন্নয়নমূলক অনেক কাজ করেছে তবে তাদের সময়কালে শিক্ষক হয়রানির মাত্রাও অনেক বেড়ে গেছে। আর রাবির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় একই প্রশাসন দ্বিতীয় বার আসেনি।’

তবে বর্তমান প্রশাসনের বাইরে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম উঠে আসছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. আবুল কাশেমের নাম। তিনি ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন বিভাগে শিক্ষক ও কর্মকর্তা কম থাকলেও তিনি একদিনের জন্য শিক্ষার্থীদের সেশনজট পড়তে দেননি। নতুন বিভাগে শিক্ষা উপকরণের স্বল্পতা হলেও তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সেই সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন।

পরবর্তী প্রশাসনে দায়িত্ব পেতে সরকারের উচ্চ মহলে যোগাযোগে পিছিয়ে নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ছাদেকুল আরেফিন। তিনি বর্তমানে সমাজকর্ম বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রশাসনের প্রথম তিন বছর ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে তিনি সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকান্ডের সঙ্গেও তিনি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্ত রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রকীব আহমদ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদটি পেতে অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় হেকেপ প্রজেক্ট শেষ হলে তিনি কয়েক লাখ টাকার হিসেব দিতে পারেননি বলে অভিযোগ আছে।

সাবেক উপাচার্য (২০০৯-১২) এম আবদুস সোবহান দৌঁড়ঝাপ করছেন নতুন করে আবারো সেই পদটি নিতে। তিনি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ বিভিন্ন পদে বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে একাধিক নিয়োগ দিয়েছিলেন। নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে এই উপাচার্যকে আদালতের কাঠগড়াতেও দাঁড়াতে হয়েছিল। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসু, টিএসসিসিসহ বিভিন্ন স্থায়ী তহবিলের কোটি কোটি টাকা শেষ করেছিলেন আবদুস সোবহান। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই তহবিলের অর্থ পরিশোধ করেন।

ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মুশফিক আহমদও পরবর্তী প্রশাসনে দায়িত্ব পেতে ‘মরিয়া’ হয়ে উঠেছেন। বর্তমান প্রশাসনে তিনি ‘ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি এসুরেন্স’ সেলের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগেও তিনি ও তার স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবা কানিজ কেয়া এই প্রশাসন থেকে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। তার স্ত্রী মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক হয়েও রাকসুর কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তাদের একাধিক পদে দায়িত্বসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা ক্ষুদ্ধ।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা চেষ্টা করছেন পরবর্তী প্রশাসনে আসতে। এই অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি থাকা অবস্থায় আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিতে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ আছে। তবে তিনি বিভেদ সৃষ্টির বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। জানা গেছে, ২০১৫ সালে শিক্ষক সমিতির নির্বাচিত সভাপতি, তার আগে ২০১০ সালে সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯৪ সালে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ সংগঠনের স্টিয়ারিং কমিটির নির্বাচিত আহ্ববায়ক ছিলেন ২০১১ সাল থেকে ১৪ সাল পর্যন্ত। এই সংগঠনের হয়ে পাঁচবার নির্বাচন করেছে। অনেকে সময় অনুপস্থিত থেকেও সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার চেষ্টা করছেন দায়িত্ব পেতে। এর আগে তিনি গত প্রশাসনের সময়ে (২০০৯-১৩) ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। ওই প্রশাসনে নিয়ম বর্হিভূতভাবে নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই শিক্ষকের স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তানজিমা ইয়াসমিন ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস (আইবিএসসি)-এর পরিচালক হিসেবে। দায়িত্ব পালন শেষে হেকেপ প্রজেক্টে কয়েক লাখ টাকার হিসেব দিতে পারেননি। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছিল।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আরেক অধ্যাপক ও বিভাগের বর্তমান সভাপতি ড. সেলিনা পারভীনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সূত্রগুলো। দায়িত্বে আসলে তিনিই হবেন রাবির প্রথম নারী উপাচার্য বা উপউপাচার্য।

রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আখতার ফারুকও বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করছেন প্রশাসনের দায়িত্ব পেতে। এর আগে তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলেও প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

তবে শিক্ষকরা বলছেন, অনেকেই যোগাযোগ রক্ষা করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য নিয়োগ দেবেন পরবর্তী প্রশাসনকে। তাই দেখার বিষয়, পরবর্তীতে কারা গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারগুলোতে বসছেন। তা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষায়।

এর বাইরেও একাধিক শিক্ষক ওই পদগুলোতে দায়িত্ব পেতে পারেন বলেও ধারণা সূত্রগুলোর। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, রাজশাহী মহানগর আওয়ামীলীগের সঙ্গে যাদের সুসম্পর্ক থাকবে তারই প্রশাসনের দায়িত্বে আসুক। আর প্রগতিশীল ছাত্র নেতারা বলছেন, যারা শিক্ষার্থী বান্ধব হবেন, নিয়োগ ও শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধসহ যেকোনো দুর্নীতি দূর করবেন তারাই হোক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য।

মন্তব্য

মতামত দিন

উচ্চ শিক্ষা পাতার আরো খবর

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক গবেষণা কতটা হচ্ছে?

নিউজ ডেস্কআটিএনএনঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ইন্সটিটিউট। এই ইন্সটিটিউটের একজন শিক্ষক তৌহিদুল হক। গত তিন বছর . . . বিস্তারিত

গবেষণা জালিয়াতি নিয়ে সামিয়া-মারজানের বাকযুদ্ধ, কেউ দায় নিতে নারাজ

নিজস্ব প্রতিনিধিআরটিএনএনঢাকা: গবেষণা কর্ম জালিয়াতির দায়ভার নিয়ে এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযুক্ত দুই শিক্ষকের মধ্যে শু . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গোলাম রসুল প্লাজা (তৃতীয় তলা), ৪০৪ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com