বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যেভাবে মুসলিম হলেন মার্কিন তরুণী মেলিন্ডা বেইলি

২৪ ডিসেম্বর,২০১৮

বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যেভাবে মুসলিম হলেন যুক্তরাষ্ট্রের মেলিন্ডা বেইলি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আরটিএনএন
ওয়াশিংটন:

“মেলিন্ডা বেইলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলিনার একজন নাগরিক যিনি নিউ ইয়র্কের বাফালো থেকে পিতামাতার সাথে সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। তার বড় বোন একজন মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করেন এবং মুসলিম হয়ে যান। মেলিন্ডা বেইলি তার মুসলিম বোনের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন দেখে আলোড়িত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে মেলিন্ডার সাথেও একটি মুসলিম ছেলের সম্পর্ক হয়। ঐ ছেলের সাথে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তিনি ধর্ম সম্পর্কে গবেষণার সিদ্ধান্ত নিলেন। একসময় ইসলাম নিয়ে গবেষণা করতে করতে হয়ে গেলেন একনিষ্ঠ মুসলিম। মেলিন্ডা বেইলির নিজের বলা এই গল্পে উঠে এসেছে ধর্ম সম্পর্কে প্রচলিত কুসংস্কার, ভুল ধারণা এবং সামাজিক ও ধর্মীয় বাধার নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে তিনি কীভাবে একজন একনিষ্ঠ মুসলিম হয়ে উঠলেন। লেখাটি আরটিএনএনের পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ তানজীমুদ্দীন।”

হাই। আমার নাম মেলিন্ডা বেইলি।

প্রায় তিন বছর আগে আমি ইসলামে ধর্মান্তরিত হলাম।

এবং আমি শুধু কিছু সাধারণ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতে চাই যেগুলো আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে কীভাবে আমি ইসলাম সম্পর্কে জানতে পেরেছিলাম।

মূলত, আমি নিউ ইয়র্কের বাফালো থেকে দক্ষিণ ক্যারোলিনায় স্থানান্তরিত হই। আমার দাদা এবং আমার দাদার দাদা সেখানে বাস করতেন, এবং তারা ক্যাথলিক ছিলেন। আমার বাবা-মা উভয়ই জন্মসূত্রে ক্যাথলিক ছিলেন। আমার বাবা পোল্যান্ডের এবং আমার মা ইতালীয়। তারা একজন মানুষের সাথে দেখা করেছিল এবং ক্যাথলিকবাদ ত্যাগ করে খ্রিস্টান হিসেবে পূনর্জন্ম লাভ করেন। বাফেলোতে আমরা একটি অ-প্রাতিষ্ঠানিক চার্চে ছিলাম। তারপর প্রায় ৮ বছর আগে আমরা উত্তর ক্যারোলিনাতে চলে আসি।

আমার বোনের গল্প
আমরা তখনও চার্চে যাচ্ছিলাম। সে সময় আমার বোনের সাথে একজনের দেখা হলো যে নিজেকে একজন মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তারা একটি গুরুতর সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। তখনও আমরা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আমরা আসলেই নিবেদিতপ্রাণ খ্রিস্টান ছিলাম।

আমার বোন গবেষণা শুরু করল। আর তাই আমরা তাকে (মুসলিম ছেলেকে) মুক্ত হাতে আমাদের পরিবারে স্বাগত জানাই। তার মতামত, তার ধর্ম এবং এই ধরনের বিষয়াদি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলাম আমরা। শেষ পর্যন্ত আমার বোন ঐ ছেলেটিকে বিয়ে করে।

পরবর্তীতে আমার বোন সিদ্ধান্ত নিল যে তাদের সন্তান নেয়ার আগে সে ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা করবে। তার সন্তানকে সে কোন ধর্মের আলোকে বড় করবে এই বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইল। কারণ সে তার সন্তানদের এমন ধর্মের সাথে পরিচয় করাতে চায়নি যা সে বিশ্বাস করেনা। সে তাদেরকে এমন কিছু দিতে চায় যা সে বিশ্বাস করে। আর তাই সে গবেষণা শুরু করলো এবং প্রায় ২ বছর গবেষণা করলো।

অতঃপর এক সময় সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো এবং আমাদের পরিবারকে জানালো সে আর ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করে না। সে জানাল সে ইসলাম ধর্ম নিয়ে অনেক গবেষণা করেছে। প্রথমে এটা সত্যিই আমাদের জন্য ভীতিকর ছিল। কারণ ধর্ম সম্পর্কে আমাদের অনেক কুধারণা ছিল এবং তার মধ্যে হঠাৎ ব্যাপক পরিবর্তন দেখা আমদের জন্য ভীতিকর ছিল। বিশেষ করে তার বিশ্বাসের প্রক্রিয়া, সে যেভাবে চলাফেরা করে এবং যেভাবে সে পোষাক-পরিচ্ছদ পরে।

আমি আসলেই ইসলামে আগ্রহী ছিলাম না। আমার বোনের ধারণার ব্যাপক পরিবর্তন দেখা সত্যিই ভয়ঙ্কর ছিল। কিন্তু অবশেষে, আমার পরিবার চার্চে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, যদিও তারা খ্রিস্টধর্ম অনুশীলন এবং এটিতে বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়নি। সেই সময়ে আমি তরুণ ছিলাম এবং আমি হাই স্কুলে যাচ্ছিলাম। এক সময় আমিও বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম যে আমি আসলে কী বিশ্বাস করি!

একদিকে আমার বাবা-মা এক কথা বলছে, আর আমার বোন অন্য কথা বলছে। তাই আমি নিজেই অনুসন্ধান করতে চাইলাম। আমি আসলে কী বিশ্বাস করি এবং কোনটি আমার জন্য সত্য তা খুঁজে বের করতে চাইলাম। এবং শুধু এজন্য একটি ধর্ম গ্রহণ করতে চাইনি যে আমি ঐ ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি।

আমি বিশ্বাস করেছি যে আমার অনুসন্ধানটি আমাকে শক্তিশালী খ্রিস্টান করে তুলবে অথবা ইসলামের প্রতি শক্তিশালী করে তুলবে যদি আমি তা গ্রহণ করতে চাই। তাই আমি আমার লক্ষ্য স্থির করলাম যে আমি অর্জন করার পরিকল্পনা করেছি, কিন্তু আসলেই আমি এটাতে খুব বেশি উৎসাহিত হলাম না তখন কারণ আমি কিশোর বয়সে ব্যস্ত ছিলাম এবং অন্যান্য কাজ করছিলাম।

এক সময় আমার বোন বিদেশে চলে গেল। পরবর্তীতে গ্রীষ্মকালের মত সময়গুলোতে সে যখন প্রত্যেকবার আমাদেরকে দেখতে আসতো, তখন সে আগের চেয়ে বেশি কট্টর ধার্মিক হয়ে উঠতো। এটা আরও ভীতিকর লাগতো। অতঃপর সে আমাকে এমন একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল যেও একজন মুসলিম ছিল এবং তার সাথে আমার একটা সম্পর্ক হয়ে গেল। কিন্তু আমরা গুরুতর সম্পর্কে যাওয়ার আগে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা আলাদা হয়ে যাবো এবং এক অপরকে দেখা দেবো না। তার কারণ হচ্ছে ঐ ব্যক্তির সাথে গুরুতর সম্পর্কে যাওয়ার আগে আমি আসলে ধর্ম সম্পর্ক গবেষণা করতে চাইলাম এবং আমি সিদ্ধান্ত নিতে চাইলাম আমি আসলে কী বিশ্বাস করতে চাই।

আমার ইসলাম নিয়ে গবেষণা
অতঃপর আমি ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা শুরু করলাম। এই কাজে আমার প্রেরণা ছিল আমার সিদ্ধান্ত নেয়ার তাড়া যে, আমি কি ঐ ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাবো কিনা এবং গুরুতর সম্পর্কে আবদ্ধ হবো কিনা। কারণ এটা ছিল অনেক বড় একটা পদক্ষেপ। ভিন্ন ধর্ম অনুশীলন করছে এমন দুজনের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ছিল অনেক কঠিন বিষয়। তাই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমি গবেষণা করতে বদ্ধ পরিকর ছিলাম।

যখন আমি গবেষণা শুরু করি, তখন আমি প্রথম যে বিষয়টি গবেষণা করেছি ইসলামে নারীর অধিকার। এটা সত্য যে আমি অনেক গুজব শুনেছিলাম। আমরা মিডিয়াতে অনেক কিছু দেখতাম এবং আমার অনেক ভুল ধারণা ছিল তাই আমি সেগুলোর বিষয়ে ধর্মের আসল কথা জানতে চাই। ইসলামে নারীর অধিকার কী ছিল তা নিয়ে আমার অনেক ভুল ধারণা ছিল। আমি ভেবেছিলাম যে ইসলামে নারীদের ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক, তাদেরকে স্বামীর পিছনে পিছনে হাঁটতে হবে, কিংবা সবসময় সম্মানের সাথে দেখতে হবে, এবং তাদেরকে গাড়ির পিছনে বসতে হবে এবং এই ধরনের আরও সাধারণ ভুল ধারণা ছিল।

যখন আমি আসলেই গবেষণা শুরু করি, তখন আমি অনেক কিছু আবিষ্কার করলাম যা দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত হয়েছিলাম। ধর্মে এমন অনেক অধিকারের কথা বলেছিল যার সাথে আমি একমত পোষণ করি এবং আমি খুঁজে পাই ইসলাম নারীদের অনেক অধিকার দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন মহিলার নিজের সম্পত্তি রাখার অধিকার আছে এবং তার নিজস্ব ব্যবসা করারও অধিকার আছে। সে তার অর্থের মালিকানা রাখতে পারবে এবং যেখানে তার স্বামীর কোন অধিকার নেই, নিজের উত্তরাধিকারে পাওয়া সম্পত্তিতেও এবং তার পিতারও নেই। সে চাইলে তার স্বামীর কোন হস্তক্ষেপ ছাড়াই তার অর্থ দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। সে সম্পত্তি রাখতে পারে এবং নিজেই ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার অধিকার রাখে। এটা এমন কিছু ছিল যা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম কারণ এসব বিষয়ে সাধারণত মানুষের মাঝে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত।

যেহেতু আমি অনেক বিষয়ে সম্মত হয়েছিলাম, তাই ধর্ম আসলেই কি বলছে তা অনুসন্ধান করতে থাকি। বড় জিনিসগুলির মধ্যে একটি ছিল এটা জানা যে মুসলমানরা আসলে কার উপাসনা করে? আমি আসলেই জানতাম না যে তারা প্রকৃতপক্ষে কী বিশ্বাস করে। আমি ভেবেছিলাম তারা মুহাম্মদের উপাসনা করত এবং তারা ঈসা মসিহের প্রতি বিশ্বাস করে না এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না। যখন আমি সত্যিই গবেষণা করলাম তখন আমি জানতে পারলাম যে তারা ঈসা মসিহের উপর বিশ্বাস করে এবং তারা ঈশ্বরেও বিশ্বাস করে, কিন্তু তারা ত্রিত্ববাদের প্রতি বিশ্বাস করে না।

ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা আমার জন্য খুব সহজ করে তোলে কুরআনের কিছু কাহিনী, কারণ আমি এরকম বহু ধারণা এবং গল্পের সাথে পরিচিত ছিলাম যেগুলো ইসলাম ধর্মে এবং খ্রিস্টান ধর্মে প্রায় এক ছিল। আমি খ্রিস্টান হিসেবে বড় হয়েছিলাম এবং এরকম অনেক গল্প শুনেছি যেগুলো ইসলামেও রয়েছে। আমাদের একই নবীগণ ছিলেন। আমাদেরও ইব্রাহীম, মূসা এবং নূহ নবীর গল্প রয়েছে। এমন আরও অনেক বিষয় যেগুলো পুরোপুরি একই। শুধু ত্রিত্ববাদটাই ছিল পার্থক্য।

ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্মে যীশু খ্রিস্ট বা ঈসা মসিহ
মুসলমানরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উপাসনা করে না। মুহাম্মদ (সা.) একজন নবী ছিলেন এবং তিনিই শেষ নবী ছিলেন। ঈসা মসিহের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক হল তারা বিশ্বাস করে যে ঈসা মসিহ সর্বোত্তম ও সম্মানিত নবীদের মধ্যে একজন। তারা এটা বিশ্বাস করে না যে ঈসা মসিহ ঈশ্বর। বরং তাদের বিশ্বাস হলো ঈসা মসিহ একজন মানুষ এবং ঈশ্বরের একজন নবী যিনি মানুষকে একক ঈশ্বরের উপাসনা করতে বলেছেন।

যে বিষয়টি নিয়ে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে একটি বড় বিতর্ক ছিল তা হলো ক্রিস্টান ধর্মে ঈশ্বরের সাথে সহযোগী অংশীদার বিবেচনা করে পিতার স্থান দিয়ে ঈসা মসিহকে ঈশ্বরের মত উপাসনা করা হয়।

তাই যখন আমি ঈসা মসিহ সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্যগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেলাম, অনেকগুলো বিষয় আমার কাছে অনেক ধরনের তাৎপর্য্য নিয়ে ধরা দিয়েছে। কারণ যখন আমি অনুসন্ধান করলাম তখন ত্রিত্ববাদ আসলে কী তা আমি বুঝতে পারলাম, ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছেও এটা পুরোপুরি বোধগম্য ছিল না। আমি ত্রিত্ববাদ অনুশীলন এবং বিশ্বাস করতাম। কিন্তু কখনোই এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি। কারণ আমি মনে করতাম ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করা ঠিক নয়। তাই আমার ধারণা ছিল অন্যকিছু অনুসন্ধান আসলে ঠিক নয় অথবা এমনটি করার জন্য অন্য কোন কারণ ছিল। আমি আমার বিশ্বাস নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম এবং খ্রিস্টান ধর্ম অনুশীলন করছিলাম।

আমি এটাও জানতে পারলাম মুসলমানরা কুমারি মাতার বিষয়টি বিশ্বাস করে। আমি ঈসা মসিহ সম্পর্কে ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্মের বক্তব্যের পার্থক্য নিয়ে অনুসন্ধান করেছি। খ্রিস্টানরা মনে করে ঈসা মসিহ ঈশ্বরের পূত্র এবং তিনিও একজন ঈশ্বর। অন্যদিকে ইসলামের বক্তব্য হলো ঈসা মসিহ ঈশ্বরের একজন নবী ছিলেন এবং তিনি নিজে কখনোই ঈশ্বর ছিলেন না। তিনি মানুষকে কখনো তার উপাসনা করতে বলেননি। তিনি বলেছেন, তোমাদেরকে ঈশ্বরের উপাসনা করতে হবে এবং মানুষকেও শুধু ঈশ্বরের উপাসনা করতে বলবে। ঈসা মসিহকে উপাসনা করতে বলো না।

তাই মুসলমান এবং খ্রিস্টানদের সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী বিষয়গুলোর উপর গবেষণা শুরু করলাম এবং এটা করলাম সম্পূর্ণ মুক্তমনে ও স্বাধীনভাবে। ইসলামের যে বিষয়টি আমার খুব ভাল লেগেছে তা হলো কোনকিছু না বুঝতে পারলে প্রশ্ন করার এবং গবেষণার অনুমতি দিয়েছে ইসলাম। আর এখানে সবকিছু বৈজ্ঞানিকভাবে, ঐতিহাসিকভাবে এবং যৌক্তিকভাবে বোধগম্য হতে হবে। ইসলামের যে বিষয়টি সত্যিই আমি খুব উপভোগ করেছি তা হলো ইসলাম ধর্মে এমন অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক বিষয়াদি রয়েছে যা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আসলে ইসলামের সাথে সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে যে ধর্মের তা হলো খ্রিস্টান ধর্ম।

কিন্ত গবেষণার এক পর্যায়ে যখন আমি সত্যিই উপলব্ধি করলাম মুসলমানদের ধর্মই সত্য এবং তাদের বিশ্বাসই উত্তম বিশ্বাস ব্যবস্থা, তখন বিভিন্ন মিডিয়ায় এবং বিভিন্ন (মুসলিম দেশের) সংস্কৃতি সম্পর্কে আমি যা কিছু শুনেছি তা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম গ্রহণে বাধা প্রদান করছিল। (আমি বুঝলাম) বিভিন্ন মুসলিম দেশ বিভিন্ন ধরণের যে সংস্কৃতির চর্চা করছে, সেগুলো সত্যিকারের ইসলামী অনুশলীন নয়। ইসলাম ধর্ম প্রায় ১৫০০ বছরের প্রতিষ্ঠিত ধর্ম। বিভিন্ন দেশ ইসলামকে গ্রহণ করেছে ঠিকই, কিন্তু তারা তাদের আঞ্চলিক সংস্কৃতির আলোকে ধর্মীয় অনেক অনুশীলনকে পরিবর্তন করে ফেলেছে।

তাই অনেক কিছুই, যেমন নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি না দেওয়া, ইসলামসম্মত নয়, বরং এটা নির্দিষ্ট দেশের সংস্কৃতি। সুতরাং মুক্তভাবে চোখ মেলে তাকানো এবং সত্য অনুসন্ধানে গবেষণা আসলেই কঠিন, বিশেষ করে যখন সবখানে সবাই ধর্মীয় কুসংস্কার লালন করে। (ধর্মের ব্যাপারে) প্রচুর পরিমাণে কুসংস্কার এবং ভুল ধারণা রয়েছে।

ধর্ম একটি বিষয় বলেছে তা হলো ঈশ্বর সব জাতির কাছেই একজন নবী পাঠিয়েছেন যারা তাদের জাতিকে বলেছে তোমরা একক ঈশ্বরের উপাসনা করো। নবীগণ বিভিন্ন জাতির মানুষের কাছে প্রেরিত হয়েছেন। এই বিশ্বাস অনুযায়ী আমাদের (জাতির নিকট প্রেরিত) নবীদেরকে আমরা চিনি এবং অন্যদেরকে আমরা চিনি না। তাদের কতেকের ঐশীগ্রন্থ ছিল, যেমন আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী মূসা (আ.), ইব্রাহীম (আ.), দাউদ (আ.) এবং সুলাইমান (আ.) এর ঐশীগ্রন্থ ছিল।

আমরা বিশ্বাস করি যে সময়ের সাথে সাথে লোকেরা ধর্ম পরিবর্তন করেছে, এবং (ঐশীগ্রন্থের) সেই মূল নথিটি হারিয়ে গেছে এবং বর্তমানে এটা তার আসল রূপে নেই এবং একই রকমভাবে অনুশীলন হচ্ছে না। বিভিন্ন জাতির কাছে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন নবীগণ এবং ঐশীগ্রন্থ পাঠানোর প্রয়োজনীয়তার মূল কারণ হলো মানুষ গ্রন্থের কথাগুলো পরিবর্তন করে ফেলেছে এবং সাংস্কৃতিকভাবে বাদানুবাদ তৈরী করে ফেলেছে।

সুতরাং ইসলাম একটি বিষয়ে দৃষ্টিপাত করেছে যে, যখন নবীগণ প্রেরিত হয়েছিলেন তখন কিছু মানুষ নিজেদের ঔদ্ধত্যের কারণে তাদেরকে আশাব্যাঞ্জকভাবে এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবে না। এর কারণ মানুষের মাঝে জাতিগত ভিন্নতা, বর্ণের ভিন্নতা, দেশের ভিন্নতা এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য। আর এটা হয় মানুষের ব্যক্তিগত ঔদ্ধত্য ও কুসংস্কারের ফলে। কিন্তু আমরা যেভাবে মানুষকে বিচার করি ঈশ্বর সেভাবে করেন না। তাই সত্য হলেও আমাদের অন্তরে ব্যক্তিগত ঔদ্ধত্যের কারণে আমরা ঐ সমস্ত ধারণাগুলোকে গ্রহণ করতে পারি না। এটি ছিল এমন এক জিনিস যা বিভিন্ন বিষয়ে আশাব্যঞ্জক দৃষ্টিপাত করতে আমাকে সত্যিকারভাবে সাহায্য করেছিল।

কুসংস্কার ও ভুল ধারণার কবলে ধর্মীয় বিশ্বাস
এখন কেবল একটা জিনিসই আমাকে ধর্মান্তরিত হতে বাধা দিচ্ছিল আর তা হলো খ্রিস্টীয় সমাজে মুসলিম হওয়া সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

একটি দেশে এমন একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হয়ে থাকা সত্যিই অনেক কঠিন যে সম্প্রদায়ের ব্যাপারে সমাজে প্রচুর ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যাদের ব্যাপারে মিডিয়ায় সবসময় খারাপ কথাই বলা হয় এবং বিপুল পরিমাণে অসত্য কথা প্রচলিত আছে। আমি স্মরণ করছি, যখন আমি প্রথম বিবেচনা করলাম আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি এবং ধর্মান্তরিত হতে যাচ্ছি তখন এটা আমার পরিবারকে বলা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। বিশেষ করে যেখানে কেউ ক্যাথলিক খ্রিস্টান, কেউ আবার পুনর্জন্ম সাধিত খ্রিস্টান এবং অন্যদিকে এটা একটি খ্রিস্টান দেশ।

আমার ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এবং ভিন্ন মতের হওয়ার কারণে আমাকে সামাজিকভাবে বয়কট করার বিষয়টি এবং জনগণ আমার দিকে যেসব কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ভুল ধারণাগুলো ছুড়ে দিবে তা শোনা এবং মোকাবিলা করা আমার জন্য সত্যিই অনেক কঠিন ছিল। আর তাই এটা ছিল আমার জন্য অনেক বড় আত্মত্যাগ যে সাংস্কৃতির আদর্শের বিরুদ্ধে যাওয়া।

উদাহরণস্বরূপ, যখন আপনি একটি ভিন্ন ধর্মের আচ্ছাদন এবং অনুশীলন করছেন তখন আপনি অনেক কুসংস্কারও পেয়ে থাকেন। আমি মনে করি এটা সত্য গ্রহণ এবং অনুসন্ধানে মানুষের জন্য বড় একটি বাধা। যা হয়ে থাকে ভুল ধারণা লালন করার কারণে এবং সামাজিকভাবে মানুষকে যেভাবে গড়ে তোলা হয় তার ফলে। আর এ কারণে ধর্ম পরিবর্তন করতে গেলে একজন মানুষকে বিপুল পরিমাণে আত্মত্যাগ এবং প্রচুর পরিমাণে কুসংস্কারের মোকাবিলা করতে হয়।

আমি স্মরণ করছি, যখন আমি মূলত আমার পরিবারকে বলতে শুরু করলাম যে আমি মুসলিম হয়ে যাবো, বিশেষ করে আমার ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ দাদা-দাদিকে। আমার দাদা-দাদি ছিল পুরোপুরি ক্যাথলিক খ্রিস্টান এবং তাদের দাদার দাদা ও দাদারাও ছিল ক্যাথলিক খ্রিস্টান। আমি যখন তাদেরকে বিষয়টি বললাম তারা সত্যিই খুব ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেল এবং আমার জন্য প্রার্থনা করল। তারা আমার জন্য খুব ব্যাথা অনুভব করেছে যে আমি পথভ্রষ্ট হয়ে গেছি কিনা!

অনেক অনেক ভুল ধারণা রয়েছে এবং এটা বিশ্বাস করা আসলেই অনেক কঠিন। আর এটাই হলো সেই কারণ যা মানুষকে মুক্তভাবে কোন কিছু দেখতে ও অনুসন্ধান করতে বাধা প্রদান করে। কারণ সে হাজারো কুসংস্কার ও কু-ধারণার সম্মুখীন হয়ে থাকে।

আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে আমি বিয়ে করলাম, ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং পরিপূর্ণ ধর্ম অনুশীলন শুরু করলাম।

মেলিন্ডা বেইলির সাক্ষাৎকার-১:

মেলিন্ডা বেইলির সাক্ষাৎকার-২:

মন্তব্য

মতামত দিন

মূল প্রতিবেদন পাতার আরো খবর

ফ্যাশন শিল্পে হিজাবের প্রাধান্য বেড়েই চলছে, আকার ৪৮৮ বিলিয়ন ডলার

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনকায়রো: বাংলাদেশি নাজমা খান যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান ১১ বছর বয়সে। তিনি ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যা . . . বিস্তারিত

ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তুর্কি যুবককে বিয়ে, অতঃপর জাপানি নারীর ইসলাম গ্রহণ

আন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনটোকিও: জাপানের মুসলমান জনগোষ্ঠী এখনো অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র এবং অধিকাংশ জাপানিই কেবল ইসলামের মৌলিক . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com