পরকীয়া: এবার স্বামীর মামলায় ডাক্তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালতের সমন

০৪ ফেব্রুয়ারি,২০১৯

পরকীয়া: এবার স্বামীর মামলায় ডাক্তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালতের সমন

বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার দীপু ও তার স্ত্রী ডাক্তার শ্রাবণী বুশরা এশা। ছবি: সংগৃহীত।

নিজস্ব প্রতিবেদক
আরটিএনএন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে চট্টগ্রামে ডাক্তার আকাশের আত্মহত্যার ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন এক বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার স্বামী।

রবিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সদর আদালতে এ মামলা করেন স্বামী সাদ্দাম হোসেন দীপু।

আদালতের বিচারক ফারজানা আহমেদ মামলাটি গ্রহণ করে মামলার দুই আসামি স্ত্রী শ্রাবণী বুশরা এশা ও তার প্রেমিক মুনতাছির ইভানের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন।

অভিযুক্ত এশা ঢাকার উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের সাবেক ছাত্রী ও বর্তমানে ধানমন্ডি এলাকার আনোয়ার খান মডার্ন আধুনিক মেডিকেল কলেজের প্রভাষক। আর মুনতাছির উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের ছাত্র।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, বাদী সাদ্দাম হোসেন দীপু ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরশহরের উত্তর মৌড়াইল মহল্লার জহিরুল ইসলামের ছেলে।

বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার দীপুর সাথে গত ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট রেজিস্ট্রি কাবিন করে উত্তর মৌড়াইল মহল্লার বাসিন্দা জেড এম ইমরান আলীর মেয়ে শ্রাবণী বুশরা এশার সাথে বিয়ে হয়।

দীপু অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে গেলে তার স্ত্রী এশার সাথে যোগাযোগ করার জন্য আসামি মুনতাছির তার বাড়িতে আসা-যাওয়া করত।

গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর দুপুরে দীপু তার অফিসের কাজে কর্মস্থলে ছিলেন। এদিন এশা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার বাবার বাড়িতে মুনতাছিরের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবি আরিফুল হক মাসুদ বলেন, সাধারণত এ ধরণের মামলা আদালত আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু পরকীয়ার ঘটনায় চট্টগ্রামে চিকিৎসক আত্মহত্যার কারণে আদালত এ ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন।

কেন বাড়ছে পরকীয়া?
পরকীয়ার মহামারি এই সভ্যতার সবচেয়ে বড় অভিশাপ। সভ্যতার ভাঙ্গনের ধারাবাহিকতায় ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিবারগুলোও। এই মহামারিতে যেন আক্রান্ত গোটা পৃথিবী।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় পারিবারিক কলহে লিপ্ত থাকলেও সামাজ ও সম্মানের ভয়ে পরকীয়ায় আসক্ত স্বামী বা স্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না ভুক্তভোগিরা।

ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ চর্চা না করার পাশাপাশি বিশ্বায়নের এই যুগে যুগোপযুগী দিক নির্দেশনার অভাবকে পরকীয়ার জন্য দায়ী করতে চান বিশেষজ্ঞরা।

ইসলাম বিয়েকে সহজ করার পাশাপাশি বনিবনা না হলে তালাকের সুযোগ দিলেও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে দূর্ভাগ্যক্রমে মুসলিম সমাজেও পরকীয়ার মাত্রা দিনদিন বেড়ে চলছে।

ডা. আকাশের আত্মহত্যার বিষয়ে পর্যালোচনা
স্ত্রীর সঙ্গে রাগ করে চট্রগ্রামের ডা. আকাশের আত্মহত্যার বিষয়টি এখন দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। একাধিক পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর দিনের পর দিন অবৈধ সম্পর্কে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশ। যন্ত্রণা এতটা প্রকট হয়ে উঠেছিল যে, শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে পাপের পথ থেকে ফেরাতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তরুণ সম্ভাবনাময়ী এ চিকিৎসক।

মৃত্যুর আগে ফেসবুকে দেয়া দুটি স্ট্যাটাসে স্ত্রী তানজিলা হক মিতুর উদ্দেশে ফেসবুকে শেষ স্ট্যাটাস দেন ডা. আকাশ। তাতে সাতটি শব্দ ছিল। যার প্রতিটি বর্ণে ছিল স্ত্রীর বেহায়পনার প্রতি ডা. আকাশের ঘৃণা ও ধিক্কার।

স্ট্যাটাসটি ছিল এ রকম- ‘ভালো থেকো আমার ভালোবাসা, তোমার প্রেমিকদের নিয়ে’। এ স্ট্যাটাস দিয়েই শরীরে বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে আত্মহত্যা করেন ডা. আকাশ।

অতি আধুনিকতার নামে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনই এখন পারিবারিক সম্পর্কগুলো ভেঙে দিচ্ছে। ধর্মীয় অনুশাসন অমাণ্য করা এসব সামাজিক সংকটের অন্যতম কারণ। বিষয়টি ফুটে ওঠেছে ডা. আকাশের স্ট্যাটাসেও।

স্ত্রীর প্রতি অভিমানী ডা. আকাশ লেখেন- ‘আমার শাশুড়ি দায়ী এসবের জন্য, মেয়েকে আধুনিক বানাচ্ছে। একটু বেশি বানিয়ে ফেলেছে। উনি চাইলে এখনো সমাধান হতো।

কথা হল আত্মহত্যাই কি আকাশের শেষ অবলম্বন ছিল?

এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক ও তেজঁগাও মাদ্রাসার শাইখুল হাদিস ড. মাওলানা মুশতাক আহমদ বলেন, স্ত্রীর অপকর্মগুলো জানার পর ডা. আকাশ স্ত্রীকে শরীয়াহ মোতাবেক তালাক দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি আত্মহত্যা করলেন, যা ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর অপরাধ।

আত্মহত্যার মাধ্যমে তার নিজের ক্ষতি হয়েছে শুধু তা নয়, তার পরিবারও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। রাষ্ট্রও একজন চিকিৎসক হারিয়েছে। এ জন্য দাম্পত্য কলহ অসহনীয় হয়ে গেলে তখন তালাকের সুযোগ ইসলামে রয়েছে। আত্মহত্যা বা নির্যাতন কোনো সমাধান নয়।

বিবাহের মোহর ও তালাক প্রসঙ্গে ড. মুশতাক আহমদ বলেন, ‘বিবাহ যেহেতু মানবজীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ, তাই ইসলামে বিবাহের বিষয়টি খুবই সহজ করা হয়েছে। বিবাহের খরচসহ যাবতীয় বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা মেনে চললে সামাজিক বিশৃঙ্খলা এতোটা প্রকট হতো না। ’

বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে ডা. আকাশের বিয়ের দিনমোহর নির্ধারিত হয়েছিল ৩৫ লাখ টাকা। তালাক দিলে যা পরিশোধ করতে হত। মোটা অংকের এ টাকার জন্য তিনি স্ত্রী মিতুকে হয়তো তালাক দেননি। এমন কথাও উঠে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

মোটা অংকের মোহর
এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার রিসার্চ ফেলো ও শায়খ আবুল হাসান আলী নদভী ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী বলেন, বর্তমানে যত সামাজিক সমস্যা হচ্ছে, এর মূল কারণ দেখলে স্পষ্ট হয় যে, শরিয়তের নির্দেশনা অমান্য করার কারণেই নানাধরণের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ডা. আকাশ দম্পতির এ মর্মান্তিক ঘটনা এখন আমাদের সামনে রয়েছে। তাদের দাম্পত্য জীবন যখন অসহনীয় হয়ে গেল, তালাকই ছিল সুন্দর সমাধান। কিন্তু মোটা অংকের মোহর এখানে বড় একটি বাধা সৃষ্টি করেছে।’

দেনমোহরের পরিমাণ কেমন হওয়া উচিত?
প্রখ্যাত এ আলেমে দ্বীন বলেন, মোহরের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি যে শরীয়তের নির্দেশনা মানা হয়নি। ইসলামে মোহরের ক্ষেত্রে যে সুন্দর নির্দেশনা রয়েছে, অনেক বড় অঙ্কের মোহর ধার্য করা যেমন শরীয়তে কাম্য নয়, তেমনই তা একেবারে তুচ্ছ ও সামান্য হওয়াও উচিত নয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কিরামের সাধারণ রীতি এ ক্ষেত্রে উত্তম আদর্শ।’

পরকীয়া, সেতো প্রতারণা!
সাধারণত দেখা যায় অসুখী দম্পতিরা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। কেউ তাদের মানসিক শান্তির জন্য, কেউ তাদের শারীরিক চাহিদার জন্য (যেটা স্পষ্টত ব্যাভিচার)। যে কারণেই জড়াক না কেন, একটা বিষয় এখানে স্পষ্ট (স্বামী-স্ত্রী) সম্পর্কের মধ্য থেকে আরেকটা সম্পর্ক তৈরি করা এটা এক ধরনের প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকা। আর এই প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি খুবই ভয়াবহ।

আসলে স্ত্রী বা স্বামী নয়, বিষয়টা হলো একটা সম্পর্কের বন্ধনে থেকে আরেকটা সম্পর্ক তৈরি করাই প্রতারণা। একজন মানুষ যখন দুই-তিনটা রিলেশন একসঙ্গে চালিয়ে যান, তখন তিনি নিজের সঙ্গেও প্রতারণা করেন। এটা একধরনের মানসিক অসুস্থতাও।

আমাদের সমাজে কারও ডিভোর্স হলে পরিবার, প্রতিবেশী সবাই ধিক্কার দেন। এই ধিক্কারের ভয়ে অনেকে গোপনে সম্পর্ক রেখে সংসার চালিয়ে যান।

আবার অনেক স্ত্রী আছেন যারা স্বামীর পরকীয়া আছে জেনেও সংসার করছেন সামাজিকতার জন্য। ছেলেমেয়ে থাকলে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে। অনেকের আবার যাওয়ার জায়গা থাকে না বলে সংসারে থেকে যান।

কথা হলো- স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে দেয়াল থাকা উচিত নয়। এই সম্পর্কটা এমন একটা সম্পর্ক, একজন নিচে নামলে অন্যকেও নামতে হয়। একজন ভালো থাকলে অন্যকেও ভালো রাখতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা একে অপরকে সময় দিতে হবে। সরাসরি কথা বলতে হবে। এতে সমাধান হলে ভালো, না হলে সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে দুটি সম্পর্কে জড়ানো বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা ও মানসিক অসুস্থতা। এতে প্রতারণা তো হবেই সেই সঙ্গে অনেক সমস্যাও তৈরি হবে।

পরকীয়ায় জড়ানোর আগে ভাবুন! সাময়িকভাবে সুখী হওয়ার জন্য আপনি যে পথ বেছে নিচ্ছেন তা আপনার ইহকাল ও পরকালে চিরস্থায়ী অশান্তি ও অপ্রাপ্তি ডেকে আনবে।

মন্তব্য

মতামত দিন

দেশজুড়ে পাতার আরো খবর

বাংলাদেশে গ্যাসের মজুদ আর কতদিন থাকবে?

নিউজ ডেস্কআরটিএনএনঢাকা: বাংলাদেশে গ্যাসের সংকট দিনকে দিন প্রবল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের অনেক বাড়িতে এখন রান . . . বিস্তারিত

বরিশাল মেডিকেলের ডাস্টবিন থেকে ২২ নবজাতক শিশুর মরদেহ উদ্ধার, দেশজুড়ে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিনিধিআরটিএনএনবরিশাল: বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেলের ডাস্টবিন থেকে ২২ অপরিণত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয় . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com