পুলিশের ‘সহায়তায়’ শহীদ বুদ্ধিজীবীর বাড়ি দখল

০৪ ডিসেম্বর,২০১৮

পুলিশের ‘সহায়তায়’ শহীদ বুদ্ধিজীবীর বাড়ি দখল

নিজস্ব প্রতিবেদক
আরটিএনএন
ঢাকা: রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ৪ কাঠার প্লটে বাড়ি করে বসবাস করছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী একেএম শামসুল হক খানের ভাই কেএম শহীদুল্লাহ ও তার ছেলেমেয়েসহ পরিবারের ঘনিষ্ঠরা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লার ডিসির দায়িত্ব পালনের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের বুলেটে শহীদ হন শামসুল হক। তার মা মাকসুদা খানমের নামে প্লটটি বরাদ্দ দেয়া হয়। তার পর থেকে বাস করে আসছিল শামসুল হকের পরিবার। ২ দশকেরও বেশি সময় ধরে ২ ও ৩ তলা বিশিষ্ট দুটি ভবনের ওপর নজর পড়ে স্থানীয় ভূমিদস্যুখ্যাত দুই ভাই শেখ জাবেদ ও শেখ আবেদের।

বাড়ি থেকে তাড়াতে নানা অসিলায় পরিবারটির ওপর নির্যাতন চলাচ্ছিল। কিন্তু ২৮ সেপ্টেম্বর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ ইব্রাহীম খানের অফিসের ১০০ গজের মধ্যে ওই বাড়িতে ২৫-৩০ জন লোক নিয়ে লুটপাট ও তাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায় জাবেদরা। শহীদ পরিবারের সদস্যদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে রাতারাতি আগের ভবন ভেঙে সেখানে দেয়াল নির্মাণ করে নতুন করে ভবন গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। শহীদ পরিবারটি এখন পুরান ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বসবাস করছে।

অভিযোগ রয়েছে, পুরো ঘটনায় পুলিশ নীরব ছিল। আতঙ্কিত পরিবারটি পরে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ চুরির বাইরে মামলা রেকর্ড করতে রাজি হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ও আতঙ্কিত পরিবারের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে এ কাজ করা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারটি নিরুপায় হয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর সঙ্গে দেখা করে সব খুলে বললে পুরো ঘটনা নতুন মোড় নেয়। পরে ঘটনা তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি।

বংশাল থানায় করা চুরির মামলাটি ন্যস্ত করা হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (দক্ষিণ বিভাগের) কাছে। বিষয়টি এখন দেখভাল করছেন কোতোয়ালি জোনাল টিমের সিনিয়র পুলিশ কমিশনার আহসানুজ্জামান। ইতিমধ্যে ডিবি পুলিশ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

এদিকে ঘটনার দিন পুলিশের ভূমিকা কী ছিল তা তদন্তে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলমকে প্রধান করে কমিটি করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ডিসি (ক্রাইম) মুনতাসিরুল ইসলাম, এডিসি (ক্রাইম) রুবাইয়াত জামান ও সদস্য সচিব এডিশনাল এসপি মাহফুজুল আলম রাসেল।

কথা হয় তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব এডিশনাল এসপি মাহফুজুল আলম রাসেলের সঙ্গে। তিনি বলেন, পুলিশ হামলাকারীদের পক্ষ নিয়েছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের অবস্থান ছিল খুব কাছে- এটা সত্য। তিনি বলেন, পুলিশের লালবাগ বিভাগের ডিসিসহ সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।’

জানতে চাইলে লালবাগ বিভাগের পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ ইব্রাহীম খান বলেন, ‘এখানে পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল না। পুলিশকে জানানোর পরপরই মামলা নেয়া হয়েছে। চুরি যাওয়া বেশ কিছু মালামাল উদ্ধার করেছে বংশাল থানা পুলিশ। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি? এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।’ তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

কথা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবীর ভাতিজা বাসার মালিক আশিকুল্লাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ২৫-৩০ জন লোক গেট ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে আমার মাথায় প্রথম অস্ত্র ঠেকিয়ে বলে চুপচাপ থাকবি, কোনো কথা বলবি না। যেভাবে বলব সেভাবে করবি। না হলে মেরে ফেলব। এ কথা শুনে আমার ছোট ভাই এগিয়ে এলে তাকে হকিস্টিক দিয়ে ব্যাপক মারধর করে। পরিবারের অন্য সদস্যদের হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে দেয়। ওরা সব মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। এরপর চলে অমানবিক নির্যাতন। রেহাই পায়নি নারী-শিশুরাও। রাত গভীর হলে শুরু হয় লুটপাট। চলে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। পরে দুটি সিএনজি ভাড়া করে আমাদের তুলে দিয়ে বলা হয়, জীবন থাকতে এ বাসায় আর কখনও ফিরবি না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আশিক বলেন, পুলিশের নাকের ডগায় রাতভর নির্যাতন, ভাংচুর এবং লুটপাট চললেও পুলিশ নীরব ছিল। মামলা করতে গেলে চুরির মামলা ছাড়া অন্য মামলা রেকর্ড করতে রাজি হয়নি বংশাল থানা পুলিশ। উপায় না পেয়ে আমরা পুলিশ প্রধানের সঙ্গে দেখা করে ঘটনার বর্ণনা দেই। তিনি অভিযোগ শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী শামসুল হক খান ছিলেন আমার বড় চাচা। মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লার ডিসি থাকার সময় ২৬ মার্চ রাতেই তাকে হত্যা করা হয়। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নবাবপুরের ২২১ নম্বরে ৪ কাঠার প্লটটি তার মা মাকসুদা খানমের নামে বরাদ্দ দেন। ৪৫ বছর ধরে ভোগদখল করে আসছি। তিনি বলেন, ১৯৯৮ সাল থেকেই শেখ জাবেদ ও শেখ আবেদ আমাদের ওপর অত্যাচার করে আসছিল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি জোনাল টিমের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার আহসানুজ্জামন যুগান্তরকে বলেন, ডিসি স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার তদন্ত করছি, ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লুটের কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। লুটের সময় ব্যবহৃত অস্ত্রসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও দুটি মামলা হয়েছে। চুরির মামলাটি ডাকাতি মামলায় রূপান্তরিত করতে আদালতের কাছে আবেদন করা হবে।’

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ভূমি দখলকারী শেখ জাবেদ ঘটনার মূল হোতা। তার নেতৃত্বেই লুট হয়। ঘটনায় জড়িত ফারুক, আলী আকবার স্বপন, ইদ্রিস মিয়া ও মিরাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।

মন্তব্য

মতামত দিন

দেশজুড়ে পাতার আরো খবর

বাংলাদেশে গ্যাসের মজুদ আর কতদিন থাকবে?

নিউজ ডেস্কআরটিএনএনঢাকা: বাংলাদেশে গ্যাসের সংকট দিনকে দিন প্রবল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের অনেক বাড়িতে এখন রান . . . বিস্তারিত

বরিশাল মেডিকেলের ডাস্টবিন থেকে ২২ নবজাতক শিশুর মরদেহ উদ্ধার, দেশজুড়ে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিনিধিআরটিএনএনবরিশাল: বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেলের ডাস্টবিন থেকে ২২ অপরিণত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয় . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com