কাঁটাতারে জড়িয়ে আছে দু’পাড়ের মানুষের চির আবেগের অশ্রু

১৫ এপ্রিল,২০১৮

চির আবেগের অশ্রু

নিজস্ব প্রতিনিধি
আরটিএনএন
পঞ্চগড়: কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। কাছে থেকেও আজ তার স্বজনরা থাকেন দূরে। বৈশাখ এলেই কাঁটাতারের দু’পাড়ের মানুষের চির আবেগের অশ্রু দেখা যায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে।

বৈশাখের তপ্ত রোদে দুই দেশের কাঁটাতারের কঠিন বেড়ার ফাঁকে স্বজনদের সাথে কুশল আর উপহার সামগ্রী বিনিময়ের মধ্য দিয়ে পঞ্চগড়ের চারটি সীমান্তে অনুষ্ঠিত হয়েছে দুই বাংলার মিলন মেলা। এপার বাংলা আর ওপার বাংলার লাখো বাঙালিকে রবিবার একত্রিত করেছে বাঙালিদের প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষের আনন্দ। সম্পর্কের টানের কাছে যেন হার মেনেছে কাঁটাতারের বেড়া।

ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিভক্তি ভুলে পাসপোর্ট-ভিসা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিজিবি-বিএসএফের বাধা-সবকিছু উপেক্ষা করে বাংলাদেশ-ভারতের নারী-পুরুষ, শিশু-যুবক, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার উপচে পড়া এ ঢল শুধুই উচ্ছাস আর আবেগের।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রবিবার (১৫ এপ্রিল) সকাল থেকে পঞ্চগড় জেলার চারটি সীমান্তে বসে বাংলাদেশ-ভারত দুই বাংলার মিলন মেলা। প্রায় একযুগ ধরে নববর্ষের সময় অঘোষিত ভাবে এই মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হলেও এবারেই প্রথম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) যৌথ উদ্যোগে এই মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হলো।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪৩ এর ৩ সাব পিলার থেকে মেইন পিলার ৭৪৪ এর ২ সাব পিলার পর্যন্ত, তেঁতুলিয়া উপজেলার মাগুরমারী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪২ এর ১১ সাব পিলার থেকে ১২ সাব পিলার পর্যন্ত, সুকানি সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪১ এর ৬ সাব পিলার থেকে ৭ সাব পিলার পর্যন্ত এবং ভুতিপুকুর সীমান্তের মেইন পিলার ৭৩৭ এর ২ সাব পিলার থেকে ৬ সাব পিলার এলাকা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার নোম্যান্সল্যান্ড এলাকায় এ মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়।

চারটি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁকে অনুষ্ঠিত দুই বাংলার লক্ষাধিক মানুষের এ মিলন মেলা চলে বিকেল পর্যন্ত। সূর্যোদয়ের পর থেকেই পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে কাঁটাতারের কাছেকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে অপরদিকে ভারতীয়রাও তাদের কাঁটাতারের কাছকাছি আসার চেষ্টা করে।

পরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাঁটাতারের বেড়ার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিলে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো উভয় দেশের মানুষজন কাঁটাতারের দুই পাশে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় তারা কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনদের সাথে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী আদান-প্রদান করে।

কাঁটাতারের বেড়ার দুই পাশে পঞ্চগড় জেলা, পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও এবং দিনাজপুর জেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ভারতের জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, রায়গঞ্জ, খালপাড়া, ভিমভিটা, গোমস্তাবাড়ি, বড়ুয়াপাড়া, চাউলহাটি ও হাতিয়াডাঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। সেই সাথে স্বজনদের দেওয়ার জন্য নিয়ে আসেন নানা রকমের উপহার সামগ্রী। দীর্ঘদিন পর স্বজনদের দেখা পয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকেই আবার স্মৃতিটুকু ধরে রাখতে নিজেদের মোবাইল ফোনে পরদেশী স্বজনদের ছবিও তুলছিলেন।

মিলন মেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ঠাকুরগাঁও সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ শামছুল আরেফীন, পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটলিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল আল হাকিম মো. নওশাদ এবং নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যটলিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল কাজী আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।

মিলন মেলায় ঠাকুরগাঁও জেলার রঙ্গীয়ানী এলাকা থেকে অমরখানা সীমান্তে আসা মিনু রানী বলেন, ‘আমার বোনের বাড়ি শিলিগুড়ির হাতিয়াডাঙ্গী এলাকায়। আড়াই বছর আগে আমার ওই বোনের যা এর মেয়ের সাথে বাংলাদেশেই আমার বড় ছেলে পুরঞ্জয় রায়ের বিয়ে হয়েছিল। পরে আমার ছেলে বৌকে নিয়ে ভারতে তার শশুর বাড়ি বেড়াতে গেলে বৌমা আর ফিরে আসতে চায়না। সেজন্য তারা এখন সেখানেই থাকে। আজকে ছেলে, ছেলের বৌ আর আমার বোনকে দেখতে এসেছি। অনেকদিন পর তাদের দেখা পেয়ে অনেক ভাল লাগলো।’

পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার থেকে আসা লিটন অধিকারী বলেন, ‘আমার চাচা অবিন্দু অধিকারী পালাপালির সময় (মুক্তিযুদ্ধের সময়) ভারতে চলে যান। এর পর থেকে প্রতিবছর নববর্ষের সময় এই সীমান্তে দেখা হয়। আজকেও আমরা পরিবারের সবাই মিলে চাচা-চাচি ও তাদের সন্তানদের দেখা করতে এসেছি।’

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির পূর্বে পঞ্চগড় জেলার পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া, বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অধীনে ছিল। বিভক্তির পর এইসব এলাকা বাংলাদেশের অর্ন্তভূক্ত হয়। দেশ বিভাগের কারনে উভয় দেশের নাগরিকদের আত্মীয়-স্বজন দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দুই দেশের নাগরিকরা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে যাওয়া আসার সুযোগ পেলেও ভারত তাদের সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করায় অবাধ যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে উভয় দেশের নাগরিকদের অনুরোধে প্রায় এক যুগ ধরে বিজিবি ও বিএসএফের সহযোগীতায় অমরখানা সীমান্তে দুই বাংলার মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটলিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল আল হাকিম মো. নওশাদ বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবার নববর্ষ উপলক্ষে পঞ্চগড় জেলার চারটি সীমান্তে দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবার জেলা প্রশাসন ও ভারতীয় বিএসএফের সাথে সমন্বয় করে এই মিলন মেলার আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষে সুবিধার্থে সুপেয় পানি ও খাবার স্যালাইন সরবরাহসহ প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দুই বাংলার এই মিলন মেলায় সৌহার্দপূর্ণ ভ্রাতৃত্ববোধের বহি:প্রকাশ ঘটেছে বলে আমি মনে করি।

এছাড়া দীর্ঘদিন পর স্বজনদের সাথে দেখা করতে পারা মানুষের আত্মার পরিতৃপ্তি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জোরদার করে তুলবে।’

মন্তব্য

মতামত দিন

দেশজুড়ে পাতার আরো খবর

জামায়াত নেতা শামসুল ইসলামের জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে প্রেরণ

নিজস্ব প্রতিনিধিআরটিএনএনচট্টগ্রাম: জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) আসনের সাবেক সংসদ . . . বিস্তারিত

কক্সবাজারের অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান, ১১ অস্ত্রসহ আটক ১

নিজস্ব প্রতিনিধিআরটিএনএনকক্সবাজার: কক্সবাজারের মহেশখালীতে অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে, এসময় ১১টি অস্ত্রসহ এক . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com