সুন্দরবনের দখল নিতে নিত্যদিন লড়াই করেন যে জলদস্যুরা

১৩ সেপ্টেম্বর,২০১৭

নিউজ ডেস্ক

আরটিএনএন

ঢাকা: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ অরণ্য। ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বনে এক সময় রাজত্ব করেছে দুটি শক্তি একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর প্রায় এক ডজন জলদস্যু দল। জনবল এবং অস্ত্রবল নির্ধারণ করেছে দলের কাঠামো এবং প্রভাব।


পাশাপশি সুন্দরবনসহ দেশের পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের মধ্যে সীমানা ভাগাভাগি করে এই জলদস্যুরা দাপটের সাথে তৎপরতা চালিয়েছে।

 

আসুন জেনে নেয়া যাক সুন্দরবনের জলদস্যুদের প্রধান দলগুলো সম্পর্কে:


১. মাস্টার বাহিনী: সদস্য সংখ্যা, অস্ত্রশক্তি আর ভাবমূর্তির দিক থেকে শক্তিশালী দলগুলোর অন্যতম মাস্টার বাহিনী। দলনেতার ছদ্মনাম কাদের মাস্টার। আসল নাম মোস্তফা শেখ। বয়স ৪৮ বছর। দলে সদস্য সংখ্যা ৪৮। খুলনার মধ্যাঞ্চল অর্থাৎ পশুর ও শিবসা নদীর মাঝের এলাকায় ছিল মাস্টার বাহিনীর তৎপরতা। পাশপাশি সাগরের জেলেদের ওপর জলদস্যুতা চালায় এই দল।


কাদের মাস্টার ৯ জন সহযোগীকে সাথে নিয়ে ৩১শে মে, ২০১৬ সালে র্যা বের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। চাঁদাবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় থেকে দলের বার্ষিক আয় ছিল আনুমানিক ছয় কোটি টাকা। কাদের মাস্টার জলদস্যু দলে যোগদান করে দলের প্রধান নোয়া মিয়ার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন এবং দলের নেতৃত্ব দখল করেন। ডাবল ও সিঙ্গেল ব্যারেল শটগান, ১২ গেজ পাম্প-অ্যকশন শটগান, নাইন মি.মি. পিস্তল ছিল দলের মূল অস্ত্রশক্তি।



ছবিতে কাদের মাস্টার

২. জাহাঙ্গীর বাহিনী: সুন্দরবনের পুর্বাঞ্চল, অর্থাৎ চাঁদপাই রেঞ্জের পশুর নদীর দুই পারের এলাকা ছিল জাহাঙ্গীর বাহিনীর সীমানা। এই বাহিনীর বিশেষত্ব হলো এরা সাগরে জলদস্যুতা চালাতো না। এই দলের সদস্য সংখ্যা ২০ জন। ৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দলটি গত ২৯শে জানুয়ারি আত্মসমর্পণ করে। ঐ অঞ্চলে তৎপর সবগুলো জলদস্যু দলের মধ্যে এই দলের নেতা জাহাঙ্গীর শিকারিকে সবচেয়ে অত্যাচারী বলে বর্ণনা করা হয়। তার জলদস্যু জীবনের শুরু মোতালেব বাহিনীর বাবুর্চি হিসেবে। এর পর ১১ বছরে ধরে জলদস্যুতা চালানোর পর তিনি এক সময় দলের হাল ধরেন।



জাহাঙ্গীর বাহিনীর নেতা জাহাঙ্গীর শিকারি।


৩. নোয়া বাহিনী: দলনেতা নোয়া মিয়ার নামে এই বাহিনী। সদস্য সংখ্যা ১২ জন। পশ্চিম সুন্দরবনের ভারত সীমান্ত থেকে শিবসা নদী পর্যন্ত এই দলের তৎপরতার সীমানা। দলনেতা নোয়া মিয়া ছিলেন মাস্টার বাহিনীর সাবেক প্রধান। নেতৃত্ব নিয়ে সমস্যা শুরু হলে তিনি দলের ভেতরে অভ্যুত্থানের শিকার হন এবং দল থেকে বহিস্কৃত হন। পরে তিনি নিজের দল গড়ে তোলেন।


৪. মজনু বাহিনী: সুন্দরবনের পশ্চিমাঞ্চলে সাতক্ষীরা জেলায় ছিল এই বাহিনীর বিচরণ ক্ষেত্র। দলের সদস্য সংখ্যা ২০ জন। দলনেতার নাম মজনু গাজী। তিনি ছিলেন খুলনার একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু তার আসল ব্যবসা ছিল জলদস্যুদের অস্ত্র এবং গুলি সরবরাহ করা। পরে তিনি মোতালেব বাহিনীর একজন অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মোতালেব বাহিনীর প্রধান মোতালেব ২০১১ সালে র্যা বের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর মজনু গাজী দলনেতা হন। তিনি সুন্দরবনের অস্ত্র ও গোলাবরুদ সরবরাহ নেটওয়ার্কের একজন হোতা। নয় জন সঙ্গী নিয়ে ১৪ই জুলাই, ২০১৬ তিনি আত্মসমর্পণ করেন।

তার জমা দেয়া অস্ত্রের মোট সংখ্যা ১৮টি।


৫.আলিফ বাহিনী: দলনেতা আলিফ মোল্লা ১৯ জন সঙ্গী নিয়ে চলতি বছরের ২৯শে এপ্রিল আত্মসমর্পণ করেন। সংগঠনের ভেতরে তিনি দয়াল নামে পরিচিত। সাতক্ষীরা জেলায় সুন্দরবনের একাংশ ছিল এই দলের কবলে। আলিফ মোল্লা ছেলেবেলা থেকে জলদস্যুতায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি মোতালেব বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। পরে নিজের দল গড়ে তোলেন। র্যা ব জলদস্যু দমনে অভিযান শুরু করার পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান। আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন।


৬. ইলিয়াস বাহিনী: এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬০ জন। সুন্দরবনের বাগেরহাট এবং খুলনা জেলার বড় অংশে এরা দস্যুতা করতো। রাজু বাহিনীর প্রধান রাজু দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এর পর ইলিয়াস দলের হাল ধরেন। দুই জন সাথী নিয়ে তিনি আত্মসমর্পণ করেন ২৪শে জুলাই,২০১৬ সালে। রাজু বাহিনীতে অস্ত্র সংখ্যা প্রায় ২০০ হলেও আত্মসমর্পণের সময় অস্ত্র জমা পড়ে সাতটা।


ছোট ছোট দস্যু দল: বড় দলগুলোর বাইরে সুন্দরবন এবং উপকূলীয় এলাকায় এক সময় বেশ কতগুলো উপদল তৎপর ছিল। এদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো: আলম বাহিনী, শান্তু বাহিনী, সাগর বাহিনী, খোকা বাবু বাহিনী, ছোট রাজু বাহিনী এবং কবিরাজ বাহিনী।


সুন্দরবনের নারী ডাকাত: রহিমা খাতুন (প্রাইভেসির স্বার্থে ভিন্ন নাম ব্যবহৃত হয়েছে।)-এর সাথে প্রতিবেদকের দেখা হয় মংলার চিলা বাজারে। অতি সাধারণ এক গ্রামীণ নারী। আটপৌরে শাড়ি পড়া। মিষ্টি স্বভাবের। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি প্রয়োজনে ভয়ানক প্রখর হতে দেখা যায়। সামনাসামনি দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না যে তিনি এক সময় সুন্দরবনের এক ভয়ঙ্কর জলদস্যু দলের নেতা ছিলেন।


১৯৮০ দশকে নন্দবালা, চরপুটিয়া, শ্যালা নদীর আশেপাশের এলাকায় জলদস্যুতা করতো রহিমা খাতুনের দল। এক সময় এই দলের নেতা ছিলেন তার বাবা। এরপর ৯০-এ দশকের মাঝামাঝি পুলিশ তাকে অস্ত্রসহ আটক করে। বিচারে তার জেল হয়। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি আর জলদস্যুতায় ফিরে যাননি। দলটিও ভেঙে যায়। এখন ছোট্ট একটি চায়ের দোকান দিয়ে তার সংসার চলে।


সূত্র: বিবিসি।

মন্তব্য

মতামত দিন

দেশজুড়ে পাতার আরো খবর

রাখাইনে বার্মিজ বাহিনীর গণহত্যায় নিহতদের গায়েবানা জানাজা

নিজস্ব প্রতিনিধিআরটিএনএনরাজশাহী: মায়ানমারের রাখাইনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গণহত্যায় নিহতদের গায়েবানা জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হ . . . বিস্তারিত

পবিত্র আশুরা ১ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক আরটিএনএনঢাকা: বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আকাশে ১৪৩৯ হিজরি সনের পবিত্র মহররম মাসের চাঁদ দেখা গেছে। ফলে শুক্রবা . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গোলাম রসুল প্লাজা (তৃতীয় তলা), ৪০৪ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com