বাংলাদেশে দুর্ঘটনা পরবর্তী জরুরী অবস্থা কতটুকু কার্যকর

৩১ জানুয়ারি,২০১৯

বাংলাদেশে দুর্ঘটনা পরবর্তী জরুরী অবস্থা কতটুকু কার্যকর

ডেস্ক নিউজ
আরটিএনএন
ঢাকা: বাংলাদেশের দুর্ঘনার পরে স্বজনদের আহত-নিহত ব্যক্তিকে নিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হলেও এর পরিত্রাণে সরকারের কার্যকর কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

এতে করে মৃত্যুর মিছিল যেমন থামছে না। তেমনই কোন আইন-কানুন বাস্তবায়ন করাও সম্ভব হচ্ছে না। খবর বিবিসি বাংলার 

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় সিরাজগঞ্জের কড্ডার মোড়ে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় কয়েকজন। ট্রাক ও বাসের সাথে সংঘর্ষে সেটি ভেঙে-চুরে যায়।

দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে একজনের ছেলে এম আব্দুল লতিফ। মায়ের সংকটজনক অবস্থায় তার মাকে নিয়ে ছুটতে হয় একটার পর একটা হাসপাতালে।

তিনি জানান, ঘটনার স্থান সিরাজগঞ্জের কড্ডার মোড়। তারপর পুলিশের গাড়ি করে সদর হসপিটালে রেখে দেয়। বেওয়ারিশ হিসাবে। ভাগ্যক্রমে আমাদের পাশের গ্রামের এক মামা সেই হসপিটালে যায়। মাকে চিনতে পারে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলনরত ইলিয়াস কাঞ্চনের একটি ভিডিও বিবিসি বাংলার ফেসবুক পাতায় প্রকাশিত হওয়ার পর সেখানে কমেন্ট করে মি. লতিফ আরো জানান, খবর পেয়ে বাড়ি থেকে তার ছোট ভাই এবং বাবা হাসপাতালে রওনা হলো আর তিনি ঢাকা থেকে।

সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজে ভর্তি করানো হয়েছিল তার মাকে।

ক্ষোভের সাথে তিনি জানান, দুর্ভাগ্য দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার বিকাল মানে ডাক্তার নাই। শুক্রবারও ডাক্তার নাই। ...এ্যাম্বুলেন্স করে রওনা হলাম ঢাকার পঙ্গু হসপিটালে। সেখানে তার মায়ের কিছুটা চিকিৎসা দেওয়ার পর বক্ষ্মব্যাধি হাসপাতালে যেতে বলে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বললো বুকে রক্ত জমছে তাড়াতাড়ি বক্ষব্যাধিতে নিন। রওনা হলাম। রাত তখন ১০ টা। তাদের এক প্রকার ঘুম থেকেই তুললাম।

তিনি জানান, ...সিট খালি নাই ঢাকা মেডিকেলে নিন। আবারো রওনা হলাম ঢাকা মেডিকেলে। রাত ১১টা। ভর্তি করলো। ইন্টার্র্নি চিকিৎসকরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি তার দুর্ভোগের কথা জানান ফেসবুক কমেন্টে।

লাতিফ জানান, ঢাকা মেডিকেলে এত কষ্ট হল যে বলে বোঝাতে পারবো না। ট্রলি পাওয়া যায় না। পেলেও টাকা আর টাকা। অপারেশন রুমে নিয়ে গেলো মাকে। বাহির থেকে মার চিৎকার শুনতেছি আমরা চার ভাইবোন। কিছুক্ষণ মা প্রাণ হারান।

বিবিসি বাংলার সামাজিক পাতায় সড়ক দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা না পেয়ে এভাবে পরিবারের স্বজনদের নির্মমভাবে হারানোর কথা তুলে ধরেন মি. লতিফ। তার মত নিজেদের জীবনের এমন করুণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন আরও অনেকে।

তাদের অনেকের অভিজ্ঞতায় যে চিত্রটি উঠে আসে সেখানে তারা লিখেছেন, যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তাদের অনেক প্রিয়জন শুধুমাত্র জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে মারা যান।

জাকির হাসান নামে আরেকজন লেখেন, ফরিদপুরের নগরকান্দায় বাসের চাকা খুলে উল্টে বাস খাদে পড়ে গেলে তার মা স্পটেই মারা যায়। ...লাশ থানায় নিয়ে যায়। পোস্টমর্টেম না করার অনুমোদন নিতে থানা পুলিশ ডিসি অফিসের ঝামেলা সেরে লাশ নিয়ে রাত দশটায় বাড়ি আসতে পারি। আল্লাহ যেন এমন বিপদ থেকে সবাইকে রক্ষা করে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কতটা কষ্ট আর বেদনার তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বুঝবে।

শওকত শাওন লেখেন,...আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকীর ১৩ দিন আগেই, আমি আমার স্ত্রীকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছি। কাঞ্চন ভাই, আমি আপনার ব্যথাটা অনেক ভালো বুঝি।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: রাস্তায় শৃংখলা কতটা ফিরলো?
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের হিসেবে, গত বছরে মোট দুর্ঘটনা হয়েছিল ৩,১০৩টি যেখানে নিহত হন ৩,৬৯৯জন।

আরেকটি সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে ২০১৭ সালে মোট সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে ৪,৯৭৯টি যাতে মৃত্যু হয়েছিল ৭, ৩৯৭ জনের। পরের বছর ২০১৮ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫,৫১৪টি যেখানে প্রাণ হারিয়েছিল ৭,২২১ জন। এগুলো মূলত পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য গণমাধ্যমে আসা খবরের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়ে থাকে।

তবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা আসলে কত সে তথ্য অনেক সময়ই পাওয়া যায়না। বাংলাদেশের সরকারি রেকর্ডে সড়কে যে পরিমাণ মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনার উল্লেখ করা হয়, বাস্তব সংখ্যাটা তার চেয়ে অনেক বেশি।

এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালের ২৯শে জুলাই ঢাকায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই স্কুল শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে যা নাড়া দিয়েছিলো পুরো দেশকেই।

শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সড়কে বিশৃঙ্খলা আর নিরাপত্তাহীনতার পুরনো বিষয়টি নতুন করে সেসময় আলোচনায় চলে আসে। সেসময় ব্যাপক চাপের মুখে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো সরকারের পক্ষ থেকে।

সে আন্দোলনের ছয় মাস পর দেখা যাচ্ছে, সড়কে বিশৃঙ্খলা রয়ে গেছে আগের মতোই। একের পর এক দুর্ঘটনাও ঘটছে।

প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসার কী ব্যবস্থা আছে?
দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সড়কে-মহাসড়কে প্রাথমিক জরুরি সেবার কী কোনও ব্যবস্থা আছে? এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, না টোটালি অ্যাবসেন্ট (না, একেবারেই অনুপস্থিত)। কিছু কিছু এনজিওর উদ্যোগে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আছে। কিন্তু সরকারিভাবে তেমন কোনও ব্যবস্থা নেই বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে যারা সাহায্য করতে আসে তার ফলে অনেক সময় আহতদের অবস্থা আরও খারাপ করে দেয়। কেউ হয়তো আটকে আছে কোন গাড়ির ভেতরে তখন তাকে টানাহেঁচড়া করে দেখা যায় তার অবস্থা খারাপের দিকে চলে যায়।

গবেষণায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান, আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে রেসপন্স না পেয়ে ৩৫% মারা যাচ্ছে। গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে তারা সেবা পেলে নিহতদের সংখ্যা আরও কমানো যেতো। অথচ এই সংক্রান্ত কোন উদ্যোগ বা প্রতিশ্রুতি সরকারের নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই গবেষক আরো জানায়, এনজিও পর্যায়ে ট্রমা সেন্টার করা হয়েছিল। ঢাকা-চট্টগ্রামের দাউদকান্দি এলাকাকে কেন্দ্র করে এসব এলাকার আশেপাশের বাসিন্দা এবং কিছু দোকানদারকে তারা প্রশিক্ষণ দিয়েছিল কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যাতে করে তারা এগিয়ে এসে জরুরি সহায়তা দিতে পারেন। সরকারিভাবে কিছু ট্রমা সেন্টার করা হয়েছিল সেগুলোও কার্যকর না।

এই বিষয়টিতে সরকারের পদক্ষেপ ভেরি পুওর জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের কোন প্ল্যানিং পলিসি দেখা যাচ্ছে না।

অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সাবেক এই প্রধান জানান, হাসপাতাল আছে কিন্তু আইনগত জটিলটার কারণ দেখিয়ে অনেক হাসপাতাল সেটি করেনা। তবে তিনি মনে করেন হাইকোর্টের সাম্প্রতিক যে নির্দেশনা এসেছে সেটি 'আশাব্যঞ্জক'। যেখানে বলা হয়েছে, কোন হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগ কোন আহত রোগীকে 'ডিনাই করতে (ফেরত দিতে)' পারবে না।

নিজের অভিজ্ঞতার বর্ননা দিয়ে অধ্যাপক শামসুল হক দুর্ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে এমনও দেখেছি যে আহত স্থানে পানি দেওয়ার মত পাইপলাইনের ব্যবস্থাও ছিল না। বালতি থেকে মগ দিয়ে পানি দিতে হচ্ছে। টুকু দেয়ার ব্যবস্থা যেখানে নেই সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা কিভাবে দেবে?

তিনি বলেন, অনেক হাসপাতাল দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দিতে অপারগতা জানায় যার ফলে রক্তক্ষরণে বা অন্যান্য জটিলতায় মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে এমন নজির রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বুয়েটের এই‌ শিক্ষক উদাহরণ তুলে ধরে আরও জানান, একজন ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে কেবলমাত্র আহত হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হলে তারা ক্ষতস্থানে প্রয়োজনীয় পানি দিতে না পারার কারণে। হাসপাতাল কাউকে জরুরি সেবা দিতে ডিনাই (অপারগতা জানালে) করলে শাস্তির ব্যবস্থা আছে কিন্তু থাকলে কী হবে নজরদারি তো নেই।

অধ্যাপক শামসুল হকের পরামর্শ হলো:
প্রথমেই ৯৯৯ এ ডায়াল করতে হবে এবং জানাতে হবে দুর্ঘটনার কথা, সে জানাতে পারবে আশেপাশে কোথায় সাহায্য পাওয়া যেতে পারে
* সময় বাঁচাতে হবে
* কেউ আটকে থাকলে না যেনো তাকে টানা-হেঁচড়া না করে

জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত এসডিজিএস লক্ষ্যমাত্রায় ২০১১-২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০% নামিয়ে আনার যে নির্দেশনা রয়েছে, সে লক্ষ্যমাত্রা কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে?

সম্ভব হবে কারণ দেখা যাবে অ্যাকসিডেন্ট হবে কিন্তু তার রিপোর্ট করা হবে না, এভাবে হয়তো দুর্ঘটনার সংখ্যা কমিয়ে আনা হবে। বিশুদ্ধ পরিসংখ্যান উঠে না এলে কিছুতেই এই সমস্যার সমাধান হবে না।

তার মতে, যানজটের কথা বলা হচ্ছে কিন্তু দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক চিকিৎসা ও জীবন বাঁচানোর বিষয়ে কোন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেই।

সড়কে নিরাপত্তা তৈরির ক্ষেত্রে দুর্যোগ মোকাবেলা যেসব ভলান্টিয়ার (স্বেচ্ছাসেবক) গড়ে তোলা হয়েছে তাদের এক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে যেতে পারে বলে মনে করেন গবেষকরা।

মন্তব্য

মতামত দিন

জাতীয় পাতার আরো খবর

খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদকআরটিএনএনঢাকা: কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও জাতিগত বিভেদ সৃষ্ . . . বিস্তারিত

খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদকআরটিএনএনঢাকা: কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও জাতিগত বিভেদ সৃষ্ . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com