সর্বশেষ সংবাদ: |
  • গাড়িবহরে হামলার বিষয়ে ড. কামালের সংবাদ সম্মেলন শুক্রবার বিকালে
  • তৃতীয় বেঞ্চে আজ শুনানি হতে পারে খালেদা জিয়ার রিট
  • নির্বাচনী সহিংসতা ‘তৃতীয় শক্তির পাঁয়তারা’ কি না খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ সিইসির

বাবর-পিন্টুসহ ১৯ জনের ফাঁসি, তারেক-হারিছসহ ১৯জনের যাবজ্জীবন

১০ অক্টোবর,২০১৮

বাবরসহ ১৯ জনের ফাঁসি, তারেক ১৭জনের যাবজ্জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক
আরটিএনএন
ঢাকা: ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় ২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের করা পৃথক দুটি মামলার রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে ফাঁসির রায় দিয়েছেন বিচারক। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ ১৯জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১১জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে স্থাপিত ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন বুধবার দুপুরে এই রায় দেন। রায়ের সময় ৩১ আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।

ঘটনার দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর পর মতিঝিল থানায় দায়ের করা হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা দু মামলার রায় ঘোষণা করা হল।

ফাঁসির আসামিরা হলেন
ফাঁসির আসামির মধ্যে আরো রয়েছেন মাওলানা তাজউদ্দিন, শেখ আবদুস সালাম, মো. আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএম, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিব্বুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মাইন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মাইন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ, মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, ডিজিএফআইর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তখনকার মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.), হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক হানিফ।

এর মধ্যে মাওলানা তাজউদ্দিন ও মোহাম্মদ হানিফ পলাতক রয়েছেন। বাকি ১৭ আসামি কারাগারে আছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা গ্রেনেড নিক্ষেপ ও বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এবং এই অপরাধে সহায়তা করে হত্যা সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযোগে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রত্যককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর আবু হোমায়রা ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, আবু বকর সিদ্দিক ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, আনিসুল মোর্সালীন, মুহিবুল মুক্তাকীন, খলিলুর রহমান খলিল, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর, মো. ইকবাল, মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার, হারিচ চৌধুরী, বাবু ওরফে রাতুল বাবু, শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও আরিফুল ইসলাম আরিফ।

আসামিদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে আরো এক বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

এছাড়া রায়ে আট পুলিশ ও তিন সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে লঘুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।

তাদের মধ্যে দুই বছর করে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক (খালেদা জিয়ার ভাগনে), লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান (সাবেক ডিসি পূর্ব), সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন (তদন্ত কর্মকর্তা) ও সাবেক পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান খান।

রায়ের একটি আদেশে দুই বছরের এবং আরেকটি আদেশে তিন বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও সাবেক এএসপি আবদুর রশীদ।

২০০৭ সালের ২২জনকে অভিযুক্ত করে প্রথম অভিযোগপত্র দেয়া হয়, পরবর্তীতে আরো ৩০জনকে সম্পূরক অভিযোগপত্রে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। হত্যা মামলায় সবাই অভিযুক্ত হলেও, বিস্ফোরক আইনের মামলায় অভিযুক্ত ৩৮জন। এদের মধ্যে তিনজনের অন্য মামলায় ফাঁসি হয়ে যাওয়ায় আজ ৪৯জনের বিষয়ে রায় দেয়া হয়।

৪৯ আসামির মধ্যে ৩১ জন কারাগারে এবং ১৮ জন পলাতক। কারাবন্দিদের মধ্যে ৮ জন জামিনে ছিলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রায়ের তারিখ ধার্য হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণ করেন।

পলাতক ১৮ আসামি হলেন- বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ, মুফতি আবদুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, আবদুস সালাম পিন্টুর দুই ভাই বাবু ওরফে রাতুল বাবু ও মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরসালিন ওরফে মুরসালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, লিটন ওরফে মাও. লিটন ওরফে দোলোয়ার হোসেন ওরফে জোবায়ের, পুলিশের সাবেক ডিসি (পূর্ব) মো. ওবায়দুর রহমান, ডিসি (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, লে. কর্নেল (অব) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার ও মেজর (অব) এটিএম আমিন।

যেভাবে ঘটনার শুরু
২১শে আগস্ট ২০০৪ ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সমাবেশ হচ্ছিলো আওয়ামী লীগের উদ্যোগে।সমাবেশের প্রায় শেষ পর্যায়ে তাতে বক্তব্য রাখছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

একটি ট্রাকের ওপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে তিনি বক্তব্য দেবার সময় তাকে ঘিরে ছিলেন দলীয় নেতারা। আর সামনের দিক থেকে তার ছবি তুলছিলো অনেক ফটো সাংবাদিক।

বক্তব্যের প্রায় শেষ পর্যায়ে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ হয়। ঘটনাস্থলে ছবি তুলছিলেন ফটো সাংবাদিক জিয়াউল ইসলাম।

‘এমন নৃশংসতা কখনো হতে পারে আমার কল্পনাতেও ছিলো না।আমি মঞ্চেই ছিলাম। চেয়ারে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি আর ধাক্কায় চেয়ার থেকে নীচে পড়ে যাই। আমার ওপরে পড়ে অনেকে। হঠাৎ ট্রাকের পাটাতনের ফাঁকে চোখে পড়লো আস্ত গ্রেনেড। সেটি বিস্ফোরিত হলে কি হতো ভাবতেও শিউরে উঠি এখনো। শেখ হাসিনা কয়েক হাত দূরে। তাকে ঘিরে মানববর্ম তৈরি করেছেন তার দলের নেতারা।’

‘গ্রেনেডের শব্দ শেষে শুরু হলো গুলির শব্দ। এক পর্যায়ে উঠে দাঁড়াই এবং গুলি থামলে ট্রাক থেকে নেমে আসি। নামার পর যা দেখি সেটি আরেক বিভীষিকা। চারদিকে আর্তনাদ, গোঙ্গানি। রক্তাক্ত পড়ে আছে বহু নারী পুরুষ। কে জীবিত কে মৃত বোঝা মুশকিল। নিজে বেঁচে আছি বুঝতে পেরে আবার ক্যামেরার শাটারে ক্লিক করতে আরম্ভ করি।’

সেদিনের সেই গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ জন আহত হন।

ঘটনার পর মামলা
গ্রেনেড হামলার ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। এ মামলাটির প্রথমে তদন্ত শুরু করে থানা পুলিশ।

পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হয়ে তদন্তের দায়িত্ব পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে। অবশ্য এর মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী আরও দুটি মামলা করেছিলেন।

পরে এসব মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।

২০০৪ সালের ২২শে আগস্ট: বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন
২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে সরকার। মাত্র এক মাস ১০ দিনের মাথায় ওই বছরের ২ অক্টোবর কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল।

অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছিল ভাড়া করা দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে। এসব লোক প্রধানত একটি সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডারদের মধ্য থেকে নেওয়া হয়, যাদের সমাবেশে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়ার মতো ভালো জ্ঞান ছিল।

যদিও ওই প্রতিবেদনে বিদেশি শক্তি বলতে কোনো দেশের নাম বলা হয়নি।

২০০৫ সালের ৯ই জুন আটক হলেন জজ মিয়া
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তের এক আলোচিত অধ্যায় জজ মিয়া। ২০০৫ সালের ৯ই জুন গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগের একটি চায়ের দোকান থেকে তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় সেনবাগ থানায়।

ঢাকা থেকে সিআইডির অনুরোধ পেয়ে সেনবাগ থানা পুলিশ জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের জন্য সোর্স নিয়োগ করে।

পরে ৯ জুন বেলা ১টার দিকে জজ মিয়াকে আটক করে থানায় খবর দেয়। এরপর পুলিশ তাকে সেখান থেকে থানায় নিয়ে আসে। পনের দিন সিআইডি পুলিশের হেফাজতে থাকার পর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর গ্রেনেড হামলার মামলায় তিনি ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দিয়েছেন বলে জানায় পুলিশ।

পরে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয় যখন গণমাধ্যমে ফাঁস হয় যে জজ মিয়ার বিষয়টি পুলিশের সাজানো।

আসামী করার বদৌলতে তার পরিবারকে টাকা দেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। এরপর নানা ঘটনাপ্রবাহের পর ২০০৮ সালে তাকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি।

পরে আদালত এ মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেন। ২০০৯ সালে মুক্তি পান জজ মিয়া।

প্রথম অভিযোগপত্র ২০০৮ এর জুনে
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির।

২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। এরপর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আখন্দ।

তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই বিএনপি নেতা তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।

৩ জুলাই ২০১১: সম্পূরক চার্জশীটে তারেক-বাবর
গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক চার্জশীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। সেদিন বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা-সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ স্বাক্ষরিত চার্জশীটটি দাখিল করেন এস আই গোলাম মাওলা।

দুটি পৃথক ট্রাঙ্কে ভর্তি করে আনা চার্জশীটে নতুন করে ৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

এর আগের চার্জশীটে ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। নতুনভাবে অভিযুক্তদের মধ্যে স্থান পান বিএনপি নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ উল্লেখযোগ্য।

এতে জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান ও জেএমবি সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড অন্য মামলায় ইতোমধ্যেই কার্যকর হওয়ায় মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়।

ফলে এ মামলায় এখন আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে। এর মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জন পলাতক রয়েছেন। বাকি আসামিদের মধ্যে কারাগারে রয়েছেন ২৩ জন এবং জামিনে ছিলেন ৮ জন। জামিনে থাকা আট জনের জামিন বাতিল করে আদালত।

মামলা চলাকালে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবীরা বারবার বলেছেন যে তারা মনে করেন ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা ও আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করা৷

তারা আদালতকে জানান,ওই হামলার আগে ঢাকায় ১০টি বৈঠক হয় এবং এসব বৈঠকে তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, হারিছ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন৷ টাকা এবং গ্রেনেড আসে পাকিস্তান থেকে৷

পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন-এর আব্দুল মজিদ বাট এই কাজে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল৷ বাংলাদেশে হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠন হরকতুল জিহাদ-এর সদস্যরা৷

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলাটির নতুন করে তদন্ত শুরু হলে অনেক নতুন তথ্য প্রকাশ পায়৷

এর ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সম্পূরক চার্জশিটে তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে আরো অনেকের নাম আসে৷

রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আদালতে এসব আসামীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়েছে।

যদিও আসামী পক্ষের আইনজীবীরা মনে করেন মামলার তদন্তই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে।

সাত বছরে ৬ তদন্ত কর্মকর্তা
গ্রেনেড হামলার পর মামলা হয়েছিলো পৃথক তিনটি। এর মধ্যে প্রথম সাত বছরের মধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয় মোট ছয়বার। প্রথম তদন্ত হয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কিন্তু কোনো প্রতিবেদন দাখিল হয়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে নতুন তদন্তে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ই জুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

ওই অভিযোগ পত্রে মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও গ্রেনেডের উৎস ও মদদদাতাদের শনাক্ত করা হয়নি। বর্তমান সরকার আমলে রাষ্ট্র পক্ষের আবেদনের পর আদালত মামলার বর্ধিত তদন্তের আদেশ দেন।

১৩ দফা সময় বাড়িয়ে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার তদন্ত শেষ হয়।

২০১২ সালের ২৮ মার্চ: মামলার বিচার শুরু
একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায়, খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ৫২ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচার কাজ শুরু হয় ২০১২ সালের ২৮শে মার্চ বুধবার৷

বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই মামলায় ওই বছর ৯ই এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়৷ এর আগে একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার শুরু হয়েছিলো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে বিশেষ ট্রাইবুনালে৷

এই মামলায় বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারেক রহমানসহ ২২ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচারকার্য শুরু হয়েছিল৷ আদালত ৬১ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছিলেন৷

আলোচিত এ মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ গ্রহণ করা হয়েছে। আরও ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার কারণ কী?
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে পরস্পরকে দায়ী করেছেন রাষ্ট্র ও আসামী পক্ষের আইনজীবীরা। রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বিবিসিকে বলেছেন, ‘আসামী পক্ষের আইনজীবীরা মামলা দুটি পাঁচ বার উচ্চ আদালতে নিয়ে যাওয়ায় আদালতের ২৯২ কার্যদিবস ব্যয় হয়েছে।’

এছাড়া তারা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে কালক্ষেপণ করেছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন বিএনপির সহ আইন বিষয়ক সম্পাদক জয়নুল আবেদিন মেজবাহ।

তিনি বলেন, ‘এই মামলায় শুরুতে ৬১ জনের সাক্ষী নেয়ার পর অধিকতর তদন্তের আবেদন করা হয়। দ্বিতীয় রিপোর্ট আসা পর্যন্ত কয়েক বছর পেরিয়ে যায়। এছাড়া প্রত্যেকটা আসামীর পক্ষে আলাদা আলাদা আইনজীবী জেরা করছেন। রাষ্ট্রপক্ষ ২২৫ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে। এটা অবশ্যই সময়সাপেক্ষ। সবই হয়েছে আইনানুগ প্রক্রিয়ায়। কোন কিছু সংক্ষিপ্ত করার কোন সুযোগ নেই।’

১৮ সেপ্টেম্বর শেষ হল বিচারপ্রক্রিয়া
গত ১৮ই সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ১০ অক্টোবর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন।

এ নিয়ে ১১৯তম কার্যদিবসে মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হল। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ৩০ ও আসামিপক্ষ ৮৯ কার্যদিবস ব্যয় করে।

এতে ঘটনার ১৪ বছর এক মাস ২০ দিন পর চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হল।

মন্তব্য

মতামত দিন

জাতীয় পাতার আরো খবর

স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীকে সজাগ থাকার  আহবান রাষ্ট্রপতির

নিজস্ব প্রতিবেদকআরটিএনএনঢাকা: রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মো. আবদুল হামিদ দেশের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত . . . বিস্তারিত

আপিল শুনানিতে আজ যারা বৈধতা ফিরে পেলেন

নিজস্ব প্রতিবেদকআরটিএনএনঢাকা: আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার বিরুদ . . . বিস্তারিত

 

 

 

 

 

 



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com