মুছে যাক হানাহানি, দৃঢ় হোক সম্প্রীতি

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান ১২ সেপ্টেম্বর,২০১৬
ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান

রাত পোহালেই মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। ঈদ উদযাপন করতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। এমন এক সময়ে এই ধর্মীয় উৎসব পালিত হচ্ছে যখন দেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে জঙ্গিবাদ সমস্যা, অন্যদিকে রাজনৈতিক সঙ্কটে দেশে এক ধরনের গুমট পরিবেশ বিরাজমান।

জাতিতে জাতিতে ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতায় মানবজাতি আজ যখন ছিন্নভিন্ন, যখন মানুষ অহংকার, হিংসা আর গ্লানি নিয়ে মিশ্র জীবনযাপন করছে; তখন ইসলামের অহিংসা, মানবপ্রেম ও শান্তির বাণী বিশ্ববাসীকে দেখাতে পারে মহামিলনের পথ এবং দিতে পারে শান্তি। সেদিক থেকে একটি আশার দিক হলো- নানা সঙ্কটের মধ্যেও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অব্যাহত রয়েছে। এইতো কিছুদিন আগে (মে মাসের শেষার্ধে) শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়ে গেল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমা।

আর ক’দিন পরেই হিন্দু সম্প্রদায় পালন করবেন তাদের বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা। দুই সম্প্রদায়ের বৃহৎ দু’টি ধর্মীয় উৎসব পাশাপাশি সময়ে উদযাপিত হওয়ায় একটা আলাদা তাৎপর্য বহন করে। উভয় ধর্মের মর্ম বাণীতে যেন নিজেদের শুদ্ধ করে নিচ্ছেন সবাই।

ফলে এটা বারবার প্রমাণিত যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করে এই দেশে। এটাই বাংলাদেশের ঐতিহ্য। আবহমানকাল ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যই আমাদের একটা বড় শক্তি।

মঙ্গলবার উদযাপিত হবে ঈদুল আযহা। ঈদ মানেই আনন্দ। তাই শিশু-কিশোর, যুবা-বৃদ্ধসহ সবার মনেই আনন্দের ধারা বয়ে যায় এই দিনে। ঈদ আসে ত্যাগ, কোরবানি, নিজের অহংবোধ বিসর্জন ও সার্বজনীন সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে। মুসলিমদের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে অফুরন্ত প্রেম-প্রীতির নবজাগরণ।

মুসলমানদের জীবনে ঈদুল আজহার গুরুত্ব ও আনন্দ অপরিসীম। উৎসব হিসেবে পবিত্র ধর্মীয় অনুভূতি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইসলামে জীবন আর ধর্ম একই সূত্রে গাঁথা। তাই ঈদ শুধু আনন্দের উৎস নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্তব্যবোধ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের বৈশিষ্ট্য। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্প্রীতির ভাবটা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

মুসলমানগণ ঈদের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট ঈদগাহে সমবেত হয়। এতে সবার মধ্যে একাত্মতা ও সম্প্রীতি ফুটে ওঠে। ইসলামের মহান ভ্রাতৃত্ববোধে সবাই উদ্দীপ্ত হয়। পারস্পরিক কোলাকুলির মাধ্যমে সব বিভেদ ভুলে গিয়ে এক অপরের ভাই বলে গৃহীত হয়। তখন ধনী-গরিবের ব্যবধান প্রাধান্য পায় না।

ঈদের আনন্দ সবাই ভাগ করে নেয়। এর ফলে ধনী-গরীব, শত্রু-মিত্র সবাই পরস্পর ভ্রাতৃত্বের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে। ঈদ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভোলার জন্য, মানুষের মধ্যে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হওয়ার জন্য পরম মিলনের বাণী নিয়ে আসে।

ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির মাধ্যমে মুসলিমদের মনের পরীক্ষা করা হয়। আল-কোরআনের বাণী অনুযায়ী- কোরবানির রক্ত, গোশত কখনোই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। শুধু দেখা হয় মানুষের খুলুছিয়াত বা তাকওয়া। হযরত ইব্রহীম (আঃ) এর খোদাভীতি আর ত্যাগের সেই ঐতিহাসিক শিক্ষাকে উঁচু করার জন্য প্রতি বছর আমাদের হাজির হয় পবিত্র ঈদুল আজহা। মানুষের মনের ভিতরে থাকা পশুত্ব, মানবিকতার ঔদ্ধত্য ও অহমিকার মূলোৎপাটন করতেই মূলত ঈদুল আজহার আগমন ঘটে মুসলিম জাহানে।

বিশ্বব্যাপী আজ যে হাহাকার ও বিপন্ন মানবতার চিৎকার, তা থেকে বিশ্ববাসীকে মুক্ত করতে ঈদুল আজহার শিক্ষা ফি বছর আমাদের সামনে এসে স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে। মানবতার কল্যাণ সাধনে ইসলাম যে কয়টি শিক্ষা মানুষের সামনে তুলে ধরে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঈদুল আজহার শিক্ষা।

ঈদুল আজহার পবিত্র এ দিনে পশু কোরবানি দিয়ে মানব মনের সমস্ত পশু প্রবৃত্তির মূলোৎপাটন এবং আত্মশুদ্ধি ও মানবিক কল্যাণ চেতনাকে শাণিত করার এটি একটি জ্বলন্ত শিক্ষা।

এভাবে ধর্মীয় একটি উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে মানুষ ও সমাজকে তুলে আনার যে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি তা অবশ্যই গুরুত্ববহ এবং ইসলামী বিধানের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য্যকেই উন্মোচিত করে।

অতএব আসুন, ঈদুল আজহার দিনে প্রকৃত ঈদের খুশি নিয়ে মানবতার কল্যাণে যা পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘বলো আমার নামাজ, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছুই মহান আল্লাহর জন্য’। আর সেই আলোকে নিজেদের জীবনকে গড়ে তুলি।

সেই সঙ্গে মনের পশুবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করি। ত্যাগের মাধ্যমে সবার মনের কালিমা দূর হোক, আমাদের সমাজে গড়ে উঠুক দৃঢ় সম্প্রীতি। ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে আমরা সবাই একই বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে শান্তিতে বসবাস করি। ঈদ মোবারক।

মন্তব্য

মতামত দিন

অন্যান্য কলাম

adv


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com