প্রশান্ত আত্মার ডাক

নাহিদ হাসান ১৪ মার্চ,২০১৬
নাহিদ হাসান

মহান আল্লাহ বলেন, যে নিজেকে শুদ্ধ করে,সেই সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে,সে ব্যর্থ হয়। [আশ শামস ৯,১০]

সুতরাং সফল হতে হলে নিজেকে শুদ্ধ করতে হবে। আর নিজেকে কিভাবে শুদ্ধ করতে হয় তা জানতে হলে আমাদের প্রথমে নিজেকে জানতে হবে। মানুষের সত্তা মূলত তিনটি বিষয়ের সমন্বয়।১) শরীর বা বাদন ২) আকল বা বুদ্ধি ৩) রুহ বা নফস।

শরীর আর বুদ্ধির ব্যাপারটা সবাই অবগত হলেও রুহ বা নফস হয়ত অতটা পরিচিত নয়। রুহ কি? মহান আল্লাহ বলেন, লোকেরা আপনাকে রুহ বা আত্মা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে জানতে চায়। আপনি বলে দিন রুহ হচ্ছে আমার প্রতিপালকের নির্দেশ মাত্র। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। [বনী ইসরাইল ৮৫]

যেহেতু রসুল (স) কেও এ বিষয়ে সামান্য কিছু জ্ঞান দেওয়া হয়েছে আমরা আর বেশি কি করে জানব! সহজ কথায় রুহ আল্লাহর একটা নির্দেশ মাত্র যার উপস্থিতি মানব দেহে প্রাণের সঞ্চার করে।

রুহ আর নফস একই বিষয় কি না তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। রুহ আর নফস একই প্রাণসত্তার দুটি নাম কিংবা দুটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবস্থা।

মানুষের জীবদ্দশায় শরীর ও রুহ সর্বদা উপস্থিত থাকলেও আকল থাকতেও পারে আবার নাও পারে। একজন পরিপূর্ণ মানুষের মধ্যে তিনটি সত্তাই বিরাজমান। সুতরাং নিজেকে শুদ্ধ করতে হলে এই তিন সত্তাকেই শুদ্ধ করতে হবে। কিভাবে আমরা এটা করতে পারি?

সহজ উত্তর। দ্বীন মানতে হবে। দ্বীন মানার মাধ্যমেই আমরা তা করতে পারি। আরেকটু সুনির্দিষ্ট করে বললে, দ্বীনের তিনটি অংশ। মানবসত্তার এই তিন দিককে শুদ্ধ করে।

দ্বীনের প্রথম বিষয় ইসলাম যা আমাদের শরীরকে পবিত্র করে। ইসলাম কি? রসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘ইসলাম হল, তুমি এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, সালাত (নামায/নামাজ) কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমজানের রোজা পালন করবে এবং বায়তুল্লাহ পৌছার সামর্থ্য থাকলে হজ পালন করবে।’

কালিমা গ্রহণ করার মাধ্যমে (পাঠ করা নয় কিন্তু) আপনি শিরক আর কুফরের থেকে পবিত্র হবেন। সালাত দিয়ে গুনাহ মুক্ত হবেন, জাকাত দিয়ে সম্পদ পবিত্র হবে, সিয়াম ও হজ দিয়ে পবিত্র হবে শরীর। এভাবে ইসলাম পালনের মাধ্যমে আমরা আমাদের বাহ্যিক দিকগুলোকে পবিত্র করতে পারি।

দ্বীনের দ্বিতীয় বিষয় হল ঈমান। রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘ঈমান হলো আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসুলগণের প্রতি এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান আনবে, আর তাকদিরের ভালমন্দের প্রতি ঈমান রাখবে।’

মানুষ কি জানে না যে গায়েবের উপর বিশ্বাস স্থাপন করাই তাদের বুদ্ধি প্রয়োগের আসল জায়গা! আপনি ভেবে দেখেন গায়েবের উপর ঈমান এনে তার প্রমাণ স্থাপন করতে কি পরিমাণ বুদ্ধির দরকার হয়। যারা এটা করতে পারেনি তারা নিঃসন্দেহে অপবিত্র।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘বস্তুতঃ এহেন কাফেরদের উদাহরণ এমন, যেন কেউ এমন কোনো জীবকে আহ্বান করছে যা কোনো কিছুই শোনে না, হাক-ডাক আর চিৎকার ছাড়া বধির মুক, এবং অন্ধ। সুতরাং তারা কিছুই বোঝে না।’ [বাকারাহ, ১৭১]

তৃতীয় বিষয় হলো- ইহসান। অনেকের কাছেই এটা অপরিচিত। যার ফলে দেহ এবং বুদ্ধির শুদ্ধতা থাকলেও নফসের দূষণ শেষ হয় না।

ইহসান কি? রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘ইহসান হলো, এমনভাবে ইবাদত-বন্দেগী করবে যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ, যদি তুমি তাকে নাও দেখ, তাহলে ভাববে তিনি তোমাকে দেখছেন।’

অর্থাৎ যার মধ্যে ইহসান আছে সে জানে তাকে সর্বদা দেখাশুনার মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে। এটা তাকে তার কর্মে এমন সতর্ক করে যে তার অন্তরও কোনো পাপ পঙ্কিলতার চিন্তা করে না, দেহ তো দূরের বিষয়।

রুহ বা নফসের পবিত্রতার দুটি ধাপ আছে। এর আগে আমরা জেনে নিই তার তিনটি অবস্থার কথা।

নফসের তিনটি অবস্থা হতে পারে- ক. নাফসুল আম্মারাহ খ. নাফসুল লাউওয়ামাহ এবং গ. নাফসুল মুৎমাইন্নাহ্।

নাফসুল আম্মারাহ্ হলো নাফসের ওই অবস্থা যে অবস্থায় তা মানুষকে শুধু মন্দ কাজের প্রতি ধাবিত করে। এসম্পর্কে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, ‘নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয়-আমার পালনকর্তা যার প্রতি অনুগ্রহ করেন। [সূরা ইউসুফ, ৫৩]।

যখন মানুষ ইসলাম ও ঈমান অনুযায়ী চলে না তখন নাফসুল আম্মারাহ্ প্রভাব বিস্তার করে এবং সে পাপাচারে নিমজ্জিত হয়। যারা গান-বাজনা-অশ্লীলতাসহ বিভিন্ন পাপে লিপ্ত এবং তাতে তারা ইতস্তত বোধ করে না তাদের আত্মা নফসুল আম্মারাহ্। আল্লাহ আমাদের এ থেকে হেফাজত করুক।

নাফসুল লাউওয়ামাহ্ হলো নাফসের ওই অবস্থা যে অবস্থায় নফস মন্দ কাজ সংঘটিত হওয়ার পর অনুতপ্ত হয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।

নাফসেলাউওয়ামাহ্ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে রয়েছে-‘আরো শপথ করি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয়।’ [সূরা কিয়ামাহ্ ২]

যখন মানুষ তার ভুল বুঝতে পারে এবং তওবা করে। যখন কেউ ইসলাম জানতে ও মানতে শুরু করে তখন নাফসুল লাওয়ামা প্রভাব বিস্তার করে এবং সে অন্যায় করতে বিব্রত বোধ করে। এটা হল মানুষের শুদ্ধতার প্রাথমিক অবস্থা।

নাফসুল মুৎমাইন্নাহ্ হলো নাফসের ওই অবস্থা যে অবস্থায় নাফস মানুষকে ভালো কাজের প্রতি ধাবিত করে অর্থাৎ ভালো কাজে প্রশান্তি লাভ করে। এই অবস্থায় আপনি তখনই আসতে পারবেন যখন আপনি আল্লাহর দ্বীনকে পূর্ণ ভালোবাসা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করবেন, আল্লাহ ও তার রাসুলের উপর ইসলামের জন্য শোকর গুজার হবেন, যখন আল্লাহর সন্তুষ্টিই আপনার সন্তষ্টি আর আল্লাহর অসন্তুষ্টিই আপনার অসন্তুষ্টি হবে। তখন আপনি আল্লাহ ও তার রাসুলকে নিজের পরিবার, সম্পদ থেকেও বেশি ভালোবাসতে পারবেন। যখন আপনার অন্তরের দুটি প্রকোষ্ঠ তার জন্য ভালোবাসা এবং তার শত্রুর জন্য ঘৃণায় পূর্ণ হবে। এই অবস্থায় আল্লাহ স্বয়ং আপনার অন্তরে ঈমান লিখে দেবেন। তার পক্ষ থেকে রুহ দ্বারা আপনাকে শক্তিশালী করা হবে।

আল্লাহপাক বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তার অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।’ [মুজাদিলাহ, ২২]

রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘যে কেউ আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে এবং আল্লাহর জন্যই ঘৃণা করে এবং (কাউকে কিছু) দিয়ে থাকে আল্লাহর জন্যই এবং (কাউকে কিছু) দেয়া থেকে বিরত থাকেও আল্লাহরই জন্য; তাহলে তার ঈমান পরিপূর্ণ হলো।” [আবু দাউদ, ৪০৬১] । এভাবে ঈমানের পুর্নতাই আপনার রুহকে পবিত্র করতে পারে, অন্য কিছু নয়।

কৌতূহল থেকে যায় নাফসুল মুতমাইন্নাহ বা পরিতৃপ্ত আত্মা এসেছে কি না কিভাবে বুঝব! মহান আল্লাহ এর একটা লক্ষণ বর্ণনা করেছেন এভাবে: প্রকৃত পক্ষে তারাই ঈমানদারযাদের সামনে যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে। [৮-২]

অর্থাৎ ঈমানপূর্ণ প্রশান্ত অন্তরের তিনটা মৌলিক দিক হলো:

১) আল্লাহর কথা স্মরণ হলে তার ভয়ে অন্যায়, পাপাচার থেকে দূরে থাকে,

২) তার আয়াত শুনলে ঈমান বেড়ে যায়, এবং

৩) দুঃখ কষ্টে সর্বদা আল্লাহর উপর ভরসা করে

আসুন আমরা ভেবে দেখি আমাদের অন্তর কি প্রশান্ত নাকি উদ্ভ্রান্তই রয়ে গেছে।

হে আল্লাহ! আপনি আপনার দয়ায় আমাদের ঈমানকে পূর্ণ করে দিন।

হে আল্লাহ! আমরা আপনার ঐ ডাকের অপেক্ষায় আছি যা আপনি আমাদের শুনিয়েছেন- ‘হে প্রশান্ত আত্মা, সন্তুষ্ট চিত্তে তোমার রবের কাছে আসো এবং আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।’ [সূরা ফাজর ২৮-৩০]

লেখক: প্রকৌশলী

মন্তব্য

মতামত দিন

অন্যান্য কলাম

adv


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গোলাম রসুল প্লাজা (তৃতীয় তলা), ৪০৪ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com