আজও মনে পড়ে সেই খেলাটির কথা

মীর হাসিব আযম ১২ মার্চ,২০১৬
মীর হাসিব আযম

৪ এপ্রিল ১৯৯৭। সকাল থেকেই কুয়ালালামপুরের আকাশ মেঘলা। দুপুরে বৃষ্টির পূর্বাভাসও রয়েছে। দুশ্চিন্তাটা এখানেই।

আজ আইসিসি ট্রফির গ্রুপ এফ এর তৃতীয় খেলায় বাংলাদেশ হল্যান্ডের সাথে খেলবে। এই গ্রুপে বাংলাদেশের সাথে আছে হল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড আর হংকং।

গ্রপের প্রথম খেলায় বাংলাদেশ হংকংকে হারিয়েছে ৭ উইকেটে। দল হিসাবে হল্যান্ড বাংলাদেশের তুলনায় দুর্বল। কাজেই গ্রুপের প্রথম খেলায় হল্যান্ডকে হারাতে তেমন বেগ পেতে হয়নি টাইগারদের।

বারো কোটি মানুষের বিশ্বকাপে খেলার দুচোখভরা স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আইসিসি ট্রফিতে অংশ নিতে মালয়েশিয়া এসেছে। আর এবারই প্রথম আইসিসি ট্রফি থেকে প্রথম তিন দল ১৯৯৯ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে।

তাই সম্ভাবনার দরজাটা অনেকটাই প্রশস্ত। তার চেয়েও বড় কথা, আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশ এবার শক্তিশালী এবং ফেভারিট দল। আরেক ফেভারিট দল হলো কেনিয়া। গ্রুপে বাংলাদেশের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী আয়ারল্যান্ডের সাথে দ্বিতীয় খেলা বৃষ্টির জন্য পরিত্যক্ত হয়েছে। আয়ারল্যান্ড ৫০ ওভার ব্যাট করে ১২৯ রান করেই সবাই আউট হয়ে যায়। জবাবে বাংলাদেশ ৬.৪ ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে ২৪ রান তোলার পরই শু‍রু হয় বৃষ্টি।

আয়ারল্যান্ডকে এমনভাবে হাতের মুঠোয় পাওয়ার পরও এভাবে পয়েন্ট ভাগাভাগি করতে কার ভালো লাগে? তাই আজকের খেলায় বড় ব্যবধানে জয় বাংলাদেশের জন্য অতি জরুরি। আজও বৃষ্টির জন্য খেলা পরিত্যক্ত হয়ে গেলে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দূরে থাক, পরবর্তী রাউন্ডে ওঠাই অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। বারো কোটি মানুষের এক বুক আশা নিরাশায় পরিণত হয়ে যেতে পারে । তাই একটা চাপা অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে দলের সব খেলোয়ার কর্মকর্তা এবং সর্বোপরি মাঠে উপস্থিত কয়েক শ দশর্ক বাংলাদেশশি সমর্থকদের মধ্যে।

এই সমর্থকরা প্রায় সবাই প্রবাসী শ্রমিক। এক দিনের উপার্জন এরা হাসি মুখে বাংলাদেশে ক্রিকেট দলকে সমর্থন দিতে বিসর্জন দিয়েছে। ক্রিকেট মালয়েশিয়াতে মোটেও জনপ্রিয় নয়। তাই আইসিসি ট্রফির এই খেলাগু‍লি কোনো স্টেডিয়ামে হচ্ছে না । মূলত খোলা মাঠেই পিচ বানিয়ে খেলাগু‍লো হচ্ছে। আর দশর্ক? একমাত্র বাংলাদেশের খেলা ছাড়া আর কোনো খেলায় কোনো দশর্ক আসে না। বাংলাদেশ দল এদিক দিয়ে অনেক ভাগ্যবান । বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ বাদ দিয়ে দল বেধে খেলা দেখতে আসছে।

টিকিটের বালাই না থাকায় বাংলাদেশের খেলাগু‍লিতে দশর্কের সংখ্যা খারাপ হচ্ছে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মালয়েশিয়া আগমন এদেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এক উদ্দীপনা ছড়িয়ে দিয়েছে। আজ খেলা হবে কুয়ালালামপুর রাবার রিসার্চ ইন্সটিটিউট মাঠে। টসে জিতে বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ে পাঠালো। খারাপ করলো না বাংলাদেশের বোলার আর ফিল্ডাররা। ৪৯.৫ ওভারে ১৭১ করে গু‍টিয়ে গেল হল্যান্ড। খুব একটা কঠিন টাগের্ট নয় বাংলাদেশের জন্য। খুশি মনেই প্যাভিলিয়নে ফিরলো বাংলাদেশ দল। একটাই ভয় বৃষ্টি যেনো কোনো অঘটন না ঘটায়।

ভাবতে ভাবতেই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলো। সে কি ভয়ানক বৃষ্টি। রাবার রিসার্চ ইন্সটিটিউট মাঠ তো আর ক্রিকেট স্টেডিয়াম নয় যে মাঠ ঢাকার বন্দোবস্ত থাকবে। শধুট পিচটা কোনোভাবে ঢেকে দেওয়া হলো। দেখতে দেখেতে আউট ফিল্ড পানিতে পূর্ণ হয়ে গেল। এ মাঠে আর খেলা শুরু করা সম্ভব হবে না।

এদিকে আরো দুঃসংবাদ, আয়ারল্যান্ড আর হংকংয়ের মধ্যে দিনের অপর খেলা ঠিক মতই চলছে, বৃষ্টি কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করেনি। বাংলাদেশ দলের খেলোয়ার ও কর্মকর্তারা মুখ শু‍কনা করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মাঠের এই অবস্থা দুঃখের কারণ হয়েছে তাদের। দর্শকদের মধ্যেও চরম হতাশা। কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না তারা। কাজ বাদ দিয়ে শুধু দেশের টানে দেশের ক্রিকেট দলকে সমর্থন করতে মাঠে এসেছে। এ কি মেনে নেওয়া যায়?

এরই মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশে সূর্য উকি ঝুকি মারা শুরু করেছে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা এর মধ্যে হয়ে গেছে। এই মাঠে তো খেলা সম্ভব নয়। মাঠ শুকানোর কোনো ব্যবস্থাও নাই এখানে। আম্পায়ার আর ম্যাচ রেফারি নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করছেন। এর মধ্যে একটা অদ্ভূত ঘটনা ঘটলো। হঠাৎ দেখা গেল কয়েকজন দর্শক খালি গা হয়ে নিজের গায়ের জামা দিয়ে মাঠ শু‍কাতে নেমে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে দশ, দশ থেকে বিশ, বিশ থেকে চল্লিশ এভাবে একে একে সব বাংলাদেশি দর্শক গায়ের জামা খুলে মাঠে নেমে পড়ল।

তাদের দেখে বাংলাদেশে দলের খেলোয়ার কর্মকর্তারাও তোয়ালে নিয়ে মাঠে নেমে পড়লেন। আশেপাশের ফ্যাক্টরিগুলিতে দ্রুত সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। অবাক হয়ে আই সি সির আয়োজক, কর্মকর্তা-কর্মচারী দেখল কোথা থেকে শত শত বাংলাদেশি শ্রমিক বালতি, বিছানার চাদর, তোয়ালে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। কি দ্রুতই না তারা আউটার ফিল্ড থেকে পানি সরিয়ে ফলেছে। শধুি তাই না তোয়ালে, বিছানার চাদর ইত্যাদি দিয়ে মাঠ থেকে পানি শুষে শু‍কনা করে ফেলেছে। কি অপূর্ব টিমওয়ার্ক!

এতোজন মানুষের ঐকান্তিক চেষ্টা কি কখনো বিফলে যেতে পারে? সূর্য ও যেনো এদের টিম ওয়ার্ক দেখে খুশি মনে হেসে উঠলো। এক ঘণ্টা পর দুচোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে দুই আম্পায়ার, মকবুল জাফর (কেনিয়া), আয়ান মেসি (ইংল্যান্ড) মাঠ পরিদর্শনে আসলেন এবং খেলা শু‍রু করার ঘোষণা দিলেন।

ডকওয়ার্থ লিউইস পদ্ধতিতে খেলায় জেতার জন্য ৩৩ ওভারে বাংলাদেশকে ১৪১ রান করতে হবে। হাজার খানেক বাংলাদেশি দর্শকের আনন্দ চিত্কারে কুয়ালালামপুর রাবার রিসার্চ ইন্সটিটিউট মাঠ কেঁপে উঠলো। এই মাঠের ইতিহাসে কোনোদিন কোনো খেলাতে এত দর্শক সমাগম কখনো হয়নি।

না, আকরাম বাহিনী এই দর্শকদের হতাশ করেননি। যদিও শুরুটা ভালো হয়নি বাংলাদেশ দলের। ১৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে অনেকটা বিপদেই পড়েছিল বাংলাদেশ দল। আকরামের ৬৮ আর নান্নুর ২২ রান দলকে ৩ উইকেটের এক বিজয় এনে দেয়।

পরদিন নিউ স্ট্রেইট টাইমস পত্রিকার খেলার পাতায় বড় করে বাংলাদেশ শ্রমিকদের মাঠ শুকানোর ছবি ছাপিয়ে বাংলাদেশ দলের বিজয়ের খবর প্রকাশ করে, যার হেডলাইন ছিল অনেকটা এরকম ‘বাংলাদেশি শ্রমিকরা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বিজয় ছিনিয়ে আনলো’।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় প্রবাসী

মন্তব্য

মতামত দিন

অন্যান্য কলাম

adv


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গোলাম রসুল প্লাজা (তৃতীয় তলা), ৪০৪ দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com