সর্বশেষ সংবাদ: |
  • গাড়িবহরে হামলার বিষয়ে ড. কামালের সংবাদ সম্মেলন শুক্রবার বিকালে
  • তৃতীয় বেঞ্চে আজ শুনানি হতে পারে খালেদা জিয়ার রিট
  • নির্বাচনী সহিংসতা ‘তৃতীয় শক্তির পাঁয়তারা’ কি না খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ সিইসির

আরেকটি আরব বসন্ত আসছে মিশরে

ড. মোহাম্মদ এলমাসরি ২৬ জানুয়ারি,২০১৬
ড. মোহাম্মদ এলমাসরি

২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারির ‘মিশরীয় গণজাগরণ’ এখন ইতিহাস। ‘রুটি, স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়ের’ দাবিতে শুরু হওয়া হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের পাঁচ বছর পূর্তি আজ।

 

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর মিশর প্রবেশ করে সম্ভাবনাময় কিন্তু কঠিন এক গণতান্ত্রিক যুগে। রাজনৈতিক দলগুলোর দেশব্যাপী কার্যক্রম, কিছু সংখ্যক গণতান্ত্রিক স্থানীয় নির্বাচন, নতুন সংবিধান এবং অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি মিশরের ৬০ বছরের সেনা একনায়কত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ২০১২ সালে মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসির প্রথম বেসামরিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া বিরাট একটি অর্জন।

 

কিন্তু মিশরের শক্তিশালী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যম কখনোই ২০১১ সালের গণ-আন্দোলনের সমর্থক ছিল না। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান মিশরের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছে। তাদেরকে সহায়তা করেছে গণতন্ত্র বিরোধী উদারপন্থী বিরোধীদল। এছাড়া মুরসি প্রশাসনের অদক্ষতাও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছিল।

 

২০১৩ সালের ৩ জুলাই মুরসি বিরোধী আন্দোলনের সহায়তায় তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির নেতৃত্বে এক সেনা অভ্যুথানে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার করা হয়। অভ্যুথানের পর দেশটির ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল সিসি এবং এক বছরের মাথায় একটি ‘লজ্জাজনক’ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।

 

গণ-অভ্যুত্থানের ৫ বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং এখনো মিশর যথারীতি স্বৈরশাসনের কবলে। সিসিকে বিপদে ফেলতে পারার মতো গণ-অসন্তোষ সম্ভবত সরকার দমন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

মিশরকে শাসন করার জন্য সিসি কঠোর আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। বিরোধীদের দমনে তাদেরকে জেলে নিক্ষেপ করা হচ্ছে, গুম করে ফেলা হচ্ছে, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হচ্ছে। এসব কাজে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যম মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

 

২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থান থেকে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী সম্ভবত একটি শিক্ষা গ্রহণ করেছে- হোসনি মোবারককে রক্ষায় তারা যে পরিমাণ বল প্রয়োগ করেছিল তা যথেষ্ট ছিল না।

 

তাই ২০১৩ সালে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর নিরাপত্তা বাহিনী ৪০,০০০ এরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করেছে এবং গণহত্যা চালিয়ে ২,৫০০ এরও বেশি লোককে হত্যা করেছে।

 

এই নির্যাতন মনে হচ্ছে সিসি সরকারের পক্ষে ভালো কাজ দিয়েছে। গুম, খুন ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ভীত মানুষ সিসি বিরোধী কোনো আন্দোলনে যোগ দেয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছে। যদিও কিছু আন্দোলন হয়েছিল কিন্তু সরকারি বাহিনীর কঠোর বেষ্টনির মধ্যে সে আন্দোলন প্রাণ পায়নি। সরকার বিরোধী কোনো আন্দোলনের খবর গণমাধ্যমে প্রচার করতে দেয়া হয়নি। ফলে ২০১১ সালের মতো গণ-অভ্যুত্থান গড়ে উঠতে পারেনি।

 

সরকার গুম ও নির্যাতনের ভয় দেখিয়েও আন্দোলন থেকে জনগণকে নিবৃত্ত করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, গত দুই মাসেই গুম সংক্রান্ত কমপক্ষে ৩০০ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য সিসি তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন আর্থিক সুযোগ সুবিধা প্রদান করছেন। কায়রোর রাব্বা স্কোয়ারে পুলিশি নির্যাতনের চিহ্ন যুক্ত স্থানে তাদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে সরকার এবং সেনাবাহিনীকে একটি মিলিয়ন ডলার মূল্যের কাজ পাইয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ‘সরকারি ক্যাম্পেইনে’র মাধ্যমে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে হামলার শিকার, বীর ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

 


এছাড়াও স্বৈরশাসক সিসির সরকার বেশকিছু বিতর্কিত বিল ও আইন পাস করেছে। আজ্ঞাবহ মেরুদণ্ডহীন সংসদ ইতিমধ্যেই সিসির বশ্যতা স্বীকার করেছে এবং দেশটির বিচার বিভাগ ন্যক্কারজনকভাবে প্রত্যেকটি কাজেই সিসিকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

 

বিচারকরা বেশকিছু গণফাঁসির রায় দিয়েছেন। এর মধ্যে ১ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যার অভিযোগে নজিরবিহীনভাবে একযোগে ৫২৯ জন আসামিকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে দেশটির আদালত।

 

কঠোর দমন-পীড়ন, নির্যাতনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে চরমপন্থা। নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষ ঝুঁকছে জঙ্গিবাদের দিকে। এরই ফলশ্রুতিতে, সিসি যুগে সন্ত্রাসী হামলার পরিমাণ অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি এবং মিশর হয়ে উঠেছে আইএসের মতো সংগঠনগুলোতে যোগদানের এক উর্বর ভূমি।

 

তবে নির্যাতন করে কতদিন দমিয়ে রাখা যায় মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। আবারো মিশরের মানুষ হয়ে উঠছে অসিহিষ্ণু। যদিও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচার করা হয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে সিসি সারা বিশ্বে গ্রহনযোগ্য কিন্তু অর্ধেকেরও বেশি মিশরীয় জনগণ ২০১৩ সালের সেনা অভ্যুত্থানের বিরোধী।

 

২৫ জানুয়ারী মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিবাদ সমাবেশ সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক সরকার। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বিরোধীদের গ্রেপ্তার, ধরপাকড়। সরকার বিরোধী সমাবেশের কথা প্রচার করায় ২০ টিরও বেশি ফেসবুক পেজের অ্যাডমিনকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া বিভিন্ন আলেম ও বক্তাদের মাধ্যমে ইসলামে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের গুরুত্ব তুলে ধরে সরকার বিরোধী সমাবেশে যোগদান থেকে জনগণকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সরকার।

 

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই সময়ের জন্য সিসি নিরাপদ, কিন্তু কতদিনের জন্য? ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলছে, আরেকটি গণঅভ্যুথান শুধু সময়ের ব্যাপার।


লেখক: ইউনিভার্সিটি অব নর্থ আলাবামার কমিউনিকেশন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
আলজাজিরা থেকে অনুবাদ: নাজমুন সাকিব

 

মন্তব্য

মতামত দিন

অন্যান্য কলাম

adv


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com