ব্রেকিং সংবাদ: |
  • ওসির গুলিতে বিএনপি নেতা মাহাবুব উদ্দিন খোকন গুরুতর আহত

আয়করদাতার সম্মান নিয়ে কথকতা

সালেহ মতীন ১৫ সেপ্টেম্বর,২০১৫
সালেহ মতীন

বাংলাদেশ পুলিশের একটি অকেজো উপাধি এখনো টিকে আছে, সেটি হলো— ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’। বাস্তবে পুলিশ আদৌ জনগণের বন্ধু হিসেবে সত্যিকার ভূমিকা পালন করে কিনা তা রীতিমতো প্রশ্নসাপেক্ষ।

আয়কর প্রসঙ্গে শিরোনাম করে পুলিশের উপাধি নিয়ে লেখা শুরু করায় পাঠকের কাছে আমি সবিনয়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আসলে পুলিশের বিষয়টি আয়করের উক্ত বিষয়ের সাথে সমান্তরাল প্রাসঙ্গিকতার মর্যাদা বহন করে বলে শুরুতেই আমি এর অবতারণা করেছি।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে, আমাদের পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব পালন এতই বিতর্কিত ও জনগণের জন্য অনিরাপদ যে, খোদ স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রীই সাংবাদিকসহ জনগণকে পুলিশ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে অনুরোধ করেছেন। আয়করের ক্ষেত্রেও আয়করদাতাগণকে অনুরূপ একটি উপাধি বা স্বীকৃতি দেয়া হয়। বলা হয় তারা রাষ্ট্রের কাছে সম্মানিত নাগরিক।

গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিনন্দন চমৎকার লোগো সম্বলিত আয়কর সংশ্লিষ্ট কাগজ-পত্রে বোল্ড করে লেখা থাকে, ‘নিয়মিত আয়কর প্রদান করুন, সম্মানিত নাগরিক হোন।’ বিষয়টি ভাবতে যে কেউ পুলকিত হবেন।

ইদানিং কয়েক বছর ধরে আয়কর মেলার মাধ্যমেও আয়কর প্রদানে জনগণকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং মেলায় আয়করদাতাগণকে বেশ সম্মানের সাথে স্বাগত জানানো হচ্ছে।

গত বছর মেলায় রিটার্ন দাখিলকারীকে ছোট ১ বোতল (২৫০ মি.লি.) পানিসহ ১টি কলমও উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এটা অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন নাগরিকের জন্য সম্মানের স্বীকৃতি সামান্য কোন ব্যাপার নয়।

রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মানিত হওয়ার আহ্বান একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আর্থিক সামর্থবানদের আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে এবং করদাতাগণের আত্মমর্যাদাবোধ উন্নত করে। সে বিবেচনায় সরকারের ঘোষণা খুবই সুন্দর ও যুগোপযোগী।

রাষ্ট্রীয় সম্মান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা কিংবা শক্তিশালী ও আপাতদৃষ্টে জটিল আয়কর আইনের ভয়ে হোক আর রাষ্ট্রের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতার কারণেই হোক আয়কর প্রদান একজন নাগরিকের ত্যাগ স্বীকারের প্রমাণ বহন করে। তবে উৎসাহী রাষ্ট্রীয় ঘোষণা ও ত্যাগ স্বীকারের কিছুদূর পরেই আয়করদাতার জন্য অপেক্ষা করছে তিক্ত ও ক্ষুব্ধ অভিজ্ঞতা। যারা নিয়মিত আয়কর দিয়ে থাকেন তারা নিশ্চয়ই এ লেখার মৌলিক বক্তব্য সহজে বুঝতে সক্ষম হবেন।

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আয়ের একটি অংশ আয়কর হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার পর যখন ন্যায্য প্রাপ্য আয়কর সনদ পেতে হয়রানির শিকার হতে হয় তখন সরকারী দুর্নীতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এ অবস্থা চলে আসছে দীর্ঘদিন থেকে কিন্তু প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এমন ভাগ্যবান আয়করদাতার সংখ্যা নিতান্তই কম যারা সঠিকভাবে নিরুপিত আয়কর পরিশোধের পরও আয়কর অফিসে কোনরকম উৎকোচ প্রদান কিংবা হয়রানি ছাড়াই আয়কর সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। দুঃখটা মূলত এখানেই। সরকারের প্রাপ্য হিসেব করে পরিশোধ করা হলো, অথচ করদাতা তার প্রাপ্য সার্টিফিকেট পেতে সম্মান তো দূরের কথা উল্টো উৎকোচ প্রদান ও হয়রানির শিকার হতে হয়।

সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলকারীর আয়কর হিসাব বিনা প্রশ্নে গৃহীত হওয়ার কথা থাকলেও আয়কর অফিসের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা চাতুর্য্যের মাধ্যমে করদাতাগণকে হয়রানির ফাঁদে ফেলে নাজেহাল করেন। তবে এ কথা ঠিক যে, এমন আয়করদাতাও আছেন যারা তাদের প্রকৃত আয়কর পরিমাণ কমাতে প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করেন এবং ছলচাতুরির আশ্রয় নেন। তাদের ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

আয়কর বলা হলেও মূলত ব্যয়ের সাথেও এর সম্পর্ক বিদ্যমান। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয়ভার যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সে হারে করমুক্ত আয়সীমা ও অন্যান্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয়ের (যেমন বাড়িভাড়া, যাতায়াত ইত্যাদি) পরিমাণ বাড়ানো হয়নি।

এর ফলে দরিদ্রশ্রেণি যেমন রিক্সাচালক, কুলি, মজুর প্রভৃতি পেশাজীবী যাদের বর্তমান দৈনিক আয় ৫০০ টাকার উপরে তারা করের আওতায় চলে আসছে যা কোন গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য সুষ্ঠু ও ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তার পরিচয় বহন করে না।

এদিকে, ন্যূনতম আয়কর ২০০০ টাকা থেকে ৩০০০ টাকা করা হয়েছে। ন্যূনতম করের পরিমাণ বাড়ানোর যৌক্তিকতা বিবেচিত হলো অথচ করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর যৌক্তিকতা ও দাবি উপেক্ষিত হওয়াটা জনগণের মৌলিক অধিকার পরিপন্থি বলে আখ্যা দেয়া যেতে পারে।

আয়করের অতীতে নজর দিলে আমরা দেখি যে, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবজনিত রাজস্ব ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত অর্থসংস্থান করার উদ্দেশ্যে ১৮৬০ সালে উপমহাদেশে আয়করের প্রচলন শুরু হয়। টানা ৫ বছর ঐ আইনটি বলবৎ থাকার পর সরকারের আর্থিক সমস্যা অনেকটা লাঘব হলে আয়করের তেমন প্রয়োজনীয়তা না থাকায় ১৮৬৬ ও ১৮৬৭ এ দু’বছর আয়কর আইন স্থগিত করা হয়।

আমাদের গণতান্ত্রিক সরকার বলছে যে, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভালো, তাহলে আয়করের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত, ন্যায্য ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ মিলছে না কেন? বস্তুত জনগণের উপর আয়করের বোঝা অতিরিক্ত কিংবা ভারসাম্যহীন পরিমাণে চাপিয়ে দেয়াটা সরকারের অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্যের প্রমাণ বহন করে।

একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— রিক্সাচালক ও কুলি-মজুরদের আয় যতই বৃদ্ধি পাক আয়কর প্রদানের ঝামেলা এড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব। কেননা, তাদের আয়ের কোন লিখিত ডকুমেন্ট নেই। রিক্সাভাড়া দিয়ে কেউ ক্যাশ মেমো দাবি করে না।

এ ক্ষেত্রে অবিবেচনাপ্রসূত কর আইনের করুণ বলিতে পরিণত হচ্ছে নিম্নমধ্যবিত্তশ্রেণীর সেই চাকুরিজীবীগণ যার মাসিক বেতন পাই টু পাই হিসাব কষে স্বাক্ষরিত পে-অ্যাডভাইস এর মাধ্যমে প্রদান করা হয় এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়কর উৎসে কর্তন করা হয়।

উল্লিখিত মজুরশ্রেণীর চেয়ে এ চাকুরিজীবীদের আয় বাস্তবে কম হলেও তাকে বাধ্যতামূলকভাবে কর পরিশোধ করতে হচ্ছে। হিসেব করলে দেখা যায় যে, বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে বেতনভোগী ঐ ব্যক্তি সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।

পরিতাপের বিষয় হলো, এ ধরনের করদাতাগণও আয়কর সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্ট অফিসের নানা টালবাহানা ও অপকৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে অবশেষে উৎকোচের বিনিময়ে সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে পারে অথবা সার্টিফিকেট গ্রহণ না করেই আয়কর রিটার্নের প্রাপ্তিস্বীকার অংশ সংরক্ষণ করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এই হলো রাষ্ট্রের কাছে সম্মানিত করদাতার সম্মান পাওয়ার নমুনা।

সরকার যদি প্রকৃতই আয়করদাতাগণকে সম্মানিত বলে মনে করে তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি, কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের নিদর্শনস্বরূপ সঠিকভাবে নিরুপিত রিটার্নের বিপরীতে আয়কর সার্টিফিকেট বিশেষ রাষ্ট্রীয় বাহক মারফৎ একটি ছোট-খাট গিফ্‌টসহ আয়করদাতার ঠিকানায় পৌঁছে দেয়া উচিত।

সেটা সম্ভব না হলে ডাক বিভাগের সহায়তায় জরুরি রাষ্ট্রীয় ডাক বিবেচনায় বিশেষ রেজিস্ট্রি ডাক মারফৎ ওই সার্টিফিকেট করদাতাগণের ঠিকানায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যদি সেটাও সরকারের পক্ষে সম্ভব না হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট আয়করদাতাগণকে ফোনে সংবাদ দেয়া যেতে পারে যে, তাদের আয়কর সার্টিফিকেট অফিসে প্রস্তুত আছে, তারা যেন সেটি অফিস থেকে নিজে অথবা ক্ষমতাপ্রাপ্ত যথাযথ প্রতিনিধি কর্তৃক গ্রহণের ব্যবস্থা করেন।

এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট করদাতা বা তার প্রতিনিধির হাতে অফিস থেকে সম্মানের সাথে আয়কর সনদ তুলে দিলেও করদাতাগণকে সম্মান করার পর্যায়ে পড়ে।

উল্লিখিত কোনটিই পরিপালন করা যদি সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে তাহলে অন্তত যথাযথ ও সঠিকভাবে প্রদত্ত করদাতাগণকে চাহিবামাত্র সার্টিফিকেট প্রদান করতে পারলেও তাদের সম্মানিত হওয়ার শেষ রক্ষাটুকু বজায় থাকে। বর্ণিত একটি উপায়ও যদি অবলম্বন করতে সরকার ব্যর্থ হয় তাহলে করদাতাগণকে প্রদত্ত ‘সম্মানিত’ উপাধি অসারশূন্য ও প্রতারণামূলক বিবেচনা করতে জনগণ বাধ্য।

আমি বিশ্বাস করি, উপরে আলোচিত পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজনীয় আইন, লোকবল, প্রযুক্তি, লজিস্টিক সুবধাদি সবই সরকারের আছে। শুধুমাত্র সরকার আন্তরিক হলেই আয়কর অফিসসমূহ থেকে দুর্নীতি ও এ সংক্রান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত বাধাসমূহ দূর করে করদাতাগণকে যথাযথ সম্মান জানানো সম্ভব।

অন্যথায় করদাতাগণকে আয়কর প্রদানের সনদ পেতে যে ভোগান্তি ও বঞ্চনার শিকার হতে হয় তা তাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতার বিপরীতে সুস্পষ্ট অকৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়।

লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও কলামিস্ট

মন্তব্য

মতামত দিন

অন্যান্য কলাম

adv


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com