ব্রেকিং সংবাদ: |
  • ওসির গুলিতে বিএনপি নেতা মাহাবুব উদ্দিন খোকন গুরুতর আহত

আমাদের মনুষ্যত্ববোধ কি একেবারেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে?

নূরে আলম সিদ্দিকী ১০ আগস্ট,২০১৫
নূরে আলম সিদ্দিকী

আধিপত্যবাদ, সীমাহীন ভোগবাদ, পুঁজিবাদ, অসহিষ্ণুতা, অতি মুনাফা, লোভ, ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রভৃতি আজকাল সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলেছে। আর তারই বাই-প্রোডাক্ট হিসাবে পৃথিবীব্যাপী, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ প্রভৃতি প্রতিনিয়ত দেখতে দেখতে আমরা অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

এ ধরনের অনেক ঘটনা কম-বেশি আমাদের দেশেও ঘটছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দেশে ঘটে যাওয়া কিছু লোমহর্ষক ও বীভৎস ঘটনা সচেতন আর বিবেকবান মানুষের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।

গত কয়েক মাস ধরে আমরা দেশে যে সকল পৈশাচিকতার নজির দেখেছি তাতে মনে হয় না মনুষ্যত্বের ন্যূনতম কোন বোধ আমাদের মাঝে অবশিষ্ট আছে।

আমরা দেখছি সন্তান তার পিতাকে হত্যা করছে, পিতা তার মাসুম বাচ্চাকে হত্যা করছে। আমরা দেখছি পরম মমতাময়ী মা তার নিজ সন্তানকে হত্যা করে আত্মহত্যা করছে। স্বামী-স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে একে অপরকে হত্যা করছে।

মায়ের পরকীয়াজনিত ব্যাভিচারকে দেখে ফেলার জন্য সন্তান খুন হচ্ছে। নারী ও শিশু গৃহকর্মী যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। প্রভাবশালীর হাতে গরীবের সন্তান নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হচ্ছে। চোর-ডাকাত সন্দেহে প্রতিনিয়ত অনেক মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য গুম-খুন, অপহরণ আর ব্লাকমেইলিং এর মহোৎসব চলছে চারদিকে। নারী, এমনকি শিশুকেও ধর্ষণ করে হত্যা করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মানবশিশু জন্ম দিয়ে, অপহরণ করে পরিকল্পিতভাবে বিকলাঙ্গ করে তাদেরকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বসিয়ে আয়ের অতি সহজ পথ বের করা হচ্ছে।

এসব চরম মানবিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত অনাচার, অবিচার, বৈষম্য, আইনের শাসনের অভাব, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, লোভ, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, অসহিষ্ণুতা, প্রতিহিংসা প্রভৃতি বিষয় দায়ী।

একই সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার আর সহিংসতাকে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে মহিমান্বিত করার ব্যাপক প্রতিযোগিতাও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বলে আমরা মনে করছি।

একজন সন্তান যখন বিপথগামী হয়ে মাদকাসক্ত আর সন্ত্রাসী হয়ে পড়ে, যত্রতত্র ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়, তখন সে পিতামাতার সামান্যতম শাসনও আর বরদাশত করতে পারে না। তখন তার যে কোন অন্যায় আবদার পূরণ না হলে সে মারমুখী হয়ে উঠে। মানসিক বৈকল্যের এক পর্যায়ে সে তার জন্মদাতা পিতা-মাতাকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

স্বামী যখন পরনারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তার স্ত্রী-সন্তানদের অবহেলার চোখে দেখতে থাকে, এমনকি তাদের ভরণ-পোষণের ব্যাপারেও উদাসীন হয়ে পড়ে, তখন এক সময়ের ভালোবাসার মানুষকে চরম শত্রু মনে হতে থাকে। আশ্রয়ের ভরসাশূন্য অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সেই নারী তখন অত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সাথে সাথে সে তার সন্তানদের হত্যা করে ফেলাকেও সমীচীন মনে করে।

অপরদিকে অনেক নিরীহ পুরুষকেও আমরা স্ত্রীর পরকীয়ার বলী হতে দেখছি। নিজেদের ব্যাভিচারকে অবারিত করতে স্ত্রী তার অবৈধ সঙ্গীকে নিয়ে তার এক সময়কার প্রিয় জীবনসঙ্গীকে হত্যা করছে।

ভারতীয় টিভি সিরিয়ালগুলো আমাদের নতুন প্রজন্মের মাঝে কতোটা ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিস্তার করেছে তার প্রমাণ হচ্ছে ঈদে সিরিয়ালের কোন এক নায়িকার পোশাকের মতো পোশাক কিনতে না পেরে আত্মহত্যা করা। মানুয়ের ন্যূনতম বিবেকবোধও যখন তার মাঝে অবশিষ্ট না থাকে তখনই কেবল এ ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় চ্যানেলগুলোও মোটেও পিছিয়ে নেই। তারাও নৈতিক অবক্ষয়কে প্রমোট করার জন্য নিত্যনতুন এক্সপেরিমেন্ট চালাচ্ছে। দেশি-বিদেশি টিভি সিরিয়ালগুলোতে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, কূটনামী, পরকীয়া, পরচর্চা, চোগলখুরী, গীবত প্রভৃতিকে অতি মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে যার নেতিবাচক প্রভাব আমাদের তরুণ সমাজকে গ্রাস করে ফেলছে। এর প্রভাব শুধু আমাদের দেশেই নয়, ভারতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরো ব্যাপক ও গভীর।

সম্প্রতি এক সংবাদে জানা গেল, বেওয়ারিশ কুকুরকে পেটানোর দায়ে ঢাকায় তিন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদেরকে কোর্টে চালান করা হয়েছে। তথাকথিত পশু অধিকার সংরক্ষণ গোষ্ঠীর চাপে নিশ্চয়ই তাদের বিচার দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হবে এবং রায়ও পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে আমরা দেখলাম, রাজন নামক এক দরিদ্র ঘরের ১৩ বছরের মানবসন্তানকে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে। আসামি ধরা পড়লেও বিচার প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা দৃশ্যমান। রাজনকে সামান্য কথিত চুরির অভিযোগে হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো এবং সেই লোমহর্ষক দৃশ্যের স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্রও তৈরি করা হলো।

অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের টাকা আত্মসাত করে, জনগণের ট্যাক্সের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেও অনেকে বিশেষ প্রোটকল নিয়ে চলাফেরা করছে এবং ধরাছোঁয়ার একেবারে বাইরে থেকে যাচ্ছে। তারা জানে এসব লুটপাটজনিত ঘাটতি জনগণের ট্যাক্সের মাধ্যমেই পূরণ করা হবে।

অপরদিকে খুলনার রাকিবকে গাড়ির চাকায় হাওয়া ঢোকানোর মেশিন দিয়ে অভিনব পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। এ যেন এক পাশবিক বিনোদন! তার অপরাধ ছিল এক গ্যারেজ ছেড়ে অন্য গ্যারেজে কাজ নিয়ে চলে যাওয়া।

শরীফের গ্যারেজে তার চাচা মিন্টু মিয়ার নিত্যদিনের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সে অন্য গ্যারেজে কাজ নিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। আর শুধুমাত্র এ কারণেই তাকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্র পছন্দের স্বাধীনতাকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে।

আইনের শাসন যখন অনুপস্থিত থাকে, দীর্ঘসূত্রিতা, প্রভাবযুক্ত আর পক্ষপাতমূলক বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষ যখন আস্থা হারিয়ে ফেলে, সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি যখন ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে, রাজনৈতিক প্রভাব যখন সব জায়গায় খাটানো শুরু হয়, যখন থানার ওসি, উপজেলার টিএনও এমনকি জেলার ডিসি-এসপিরা পর্যন্ত অলিগলি আর ফুটপাতের নেতা-ক্যাডারদের হুমকি-ধমকিকে উপেক্ষা করার সাহস হারিয়ে ফেলে।

যখন কেউ মনে করে যে, অমুক নেতার ক্যাডার আমার বন্ধু অথবা আমি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের ওয়ার্ড কমিটির একজন মেম্বার হিসাবে আমাকে কিছু বলার সাধ্য কার, আমি যা খুশি তাই করবো আমার কিছুই হবে না, নেতার ক্যাডার হওয়ার কারণে আমার সাতখুন মাফ, তখন সমাজে অরাজকতা, অনাচার-অত্যাচার, বৈষম্য, বেহায়াপনা ব্যাপকহারে বাড়তে বাধ্য।

আর এভাবেই রাজন হত্যাকারী নরপশু কামরুল, রাকিব হত্যাকারী মিন্টু মিয়া আর শরীফরা সসম্মানে বেকসুর খালাস পেয়ে যাবে। আর বিবেকবান অসহায় সাধারণ মানুষ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে।

সম্প্রতি আরেকটি ঘটনা বিবেকবান মানুষকে না ভাবিয়ে পারেনি। একজন নারী ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য জ্বিনে ধরার ভান করে, পাগল সেজে নিজের তিন বছরের সন্তানকে পিটিয়ে মেরেই ফেলল।

সুদখোর মহাজনদের মতো আজকাল হাজার হাজার এনজিও, বিদেশি বড় বড় ফাউন্ডেশন থেকে ডোনেশন ভিক্ষা করে এনে, সেই ডোনেশনের অধিকাংশ টাকা নিজেদের বিলাসবহুল অফিস তৈরি আর গাড়ি কেনায় ব্যয় করে দারিদ্র্য দূরীকরণ আর জনসেবার নামে চড়া হারে সুদের ব্যবসা করছে।

অতি দরিদ্র ঋণগ্রহীতারা যখন কোন একটা কিস্তি শোধ করতে অপারগ হয় তখন তাদের নানা হুমকি-ধমকি, ভয় আর অপমানের মাধ্যমে প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। আর তখনই দরিদ্র মানুষগুলো ঋণমুক্ত হতে গিয়ে সর্বস্ব হারায়। এমনকি কিডনী, লিভারের মতো নিজ দেহের অঙ্গ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধে বাধ্য হয় এবং ফলস্বরূপ নিজের ও পরিবার পরিজনের জীবন বিপন্ন হয়।

এসব ভয়াবহ অনাচার আর পৈশাচিকতা থেকে রক্ষা পেতে সমাজের সচেতন নাগরিকদের এখনই এগিয়ে আসতে হবে। রুখে দাঁড়াতে হবে সকল অন্যায়-অবিচার, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে। একমাত্র সুস্থ সামাজিক ও মানবিক চেতনাবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া এ সকল বীভৎসতা বন্ধ করা সম্ভব।

লেখক: ব্যাংকার
Email: proxima7507@gmail.com

মন্তব্য

মতামত দিন

অন্যান্য কলাম

adv


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com