মাতৃগর্ভে শিশু গুলিবিদ্ধ, আসামি আমরা ১৬ কোটি

রেজা রায়হান ০৩ আগস্ট,২০১৫
রেজা রায়হান

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যে আজ কতটা অনিরাপদ তার বড় উদাহরণ মাগুরার নাজমা বেগমের গর্ভের অনাগত সন্তান ‘বেবি অব নাজমা বেগম’র (হাসপাতালের খাতায় দেয়া নাম) মাতৃগর্ভে বুলেটবিদ্ধ হওয়া।

এতবড় দুর্ঘটনার পরেও শিশুটির বেঁচে যাওয়া আমাদের জন্য পরম সৌভাগ্য।

এটা পরম করুণাময়ের অশেষ রহমত যে, তিনি আমাদেরকে কেবল জমাট রক্তবিন্দু থেকেই (পবিত্র কোরআনের ভাষায়—খালাকাল ইনসানা মিন আলাক) সৃষ্টি করেননি, মাতৃগর্ভেও আমাদের দিয়েছেন নিরাপত্তা। এমনকি মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকেও বাঁচিয়ে রেখেছেন।

চিকিৎসকরা বলেছেন, গর্ভের শিশুটির কারণে গুলিবিদ্ধ হয়েও ওর মা নাজমা বেগম বেঁচে গেছেন। এটা আল্লাহ’র অশেষ কুদরতেরই নিদর্শন।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মতে, শিশুটি এখনও আশঙ্কামুক্ত নয়। তবে এ মুহূর্তে সবার কামনা শিশুটি সুস্থ-সবলভাবে বেঁচে থাকুক। অকালীন (প্রি-ম্যাচিউর) আগমন হলেও পরম করুণাময় তাকে দান করুণ কল্যাণময় পূর্ণকালীন জীবন।

যেখানে ‘শিশুরা সুন্দর মাতৃক্রোড়ে’, সেখানে জন্মের আগে বাংলাদেশে মাতৃগর্ভেও শিশু নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই হচ্ছে সার্বিক চিত্র। যেখানে কেউই এখন নিরাপদ নয়। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই।

৭০ বছর আগে কবি সুকান্ত চট্টপাধ্যায় বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা ২ দফা স্বাধীনতা অর্জন, বার বার গণতন্ত্র ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ করেও বাংলাদেশকে তো নয়ই, এমনকি মাতৃগর্ভকেও অনাগত শিশুর জন্য নিরাপদ করতে পারিনি। মাতৃগর্ভেও শিশু অপ্রত্যাশিতভাবে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হচ্ছে।

পুলিশের সর্বাধিনায়ক মহাপুলিশ পরিদর্শকের (আইজিপি) মর্যাদা বাড়িয়ে সচিবের উপরে ‘সিনিয়র সচিব’ করা হয়েছে। পুলিশে সচিব পদমর্যাদার অনেক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণীর ওসিকে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রায়ই পুলিশের জনবল বাড়ানো হচ্ছে। বিএনপি সরকারের সময় ‘বাবরের আমল’ থেকে পুলিশের গাড়ি-অস্ত্র-সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, এটা কি কেউ দাবি করতে পারবেন?

বাংলাদেশের ‘অতি দক্ষ’ পুলিশ কোন ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সন্ত্রাস ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটলে, এমনকি না ঘটলেও শত-সহস্র অজ্ঞাতনামা আসামির কথা উল্লেখ করে মামলা দায়ের করে থাকে। গ্রেপ্তার ও মামলা বাণিজ্যে অত্যন্ত পারদর্শী পুলিশ যে কাউকেই গ্রেপ্তার করে ওই মামলার অজ্ঞাতনামা আসামির অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে সোপর্দ করে।

মাগুরার ‘বেবি অব নাজমা’ ইডিডি (এক্সপেক্টেড ডেট অব ডেলিভারি) বা জন্মের সম্ভাব্য সময়ের এক মাস আগে দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে এই পৃথিবীতে এসেছে।

তার জন্মপূর্ব গুলিবিদ্ধ হওয়ার জন্য আমরা কাকে দায়ী করবো?

ছাত্রলীগের একপক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে নাজমা ও ‘বেবি অব নাজমা বেগম’ এর গুলিবিদ্ধ হওয়ার জন্য ছাত্রলীগের ১৬ বা ১৭ জনের এক দঙ্গল আসামিকে আমরা কি এ ঘটনার জন্য দায়ী করবো, না ছাত্রলীগের হাতে যারা খাতা-কলমের বদলে অস্ত্র তুলে দিয়েছে, বা যাদের অনুপ্রেরণায় এই ছাত্রলীগাররা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে তাদেরকে দায়ী করবো?

কিভাবে তারা অস্ত্র পেল? কেন দেশজুড়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগসহ নানা লীগের নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি চলছে? আগে আওয়ামী লীগ-বিএনপি, আওয়ামী লীগ-জামায়াত, ছাত্রলীগ-ছাত্রদল, ছাত্রলীগ-শিবিরের মধ্যে যে গোলাগুলি, খুনোখুনি হতো এখন তা প্রায় বন্ধের পথে। কিন্তু প্রকৃতিতে কিছুই শূন্য থাকে না। তাই এ স্থান দখল করেছে লীগেরা।

এখন কোথাও কোথাও চলছে ‘সেইম সাইড ক্রসফায়ার’। নিজেদের সাথে নিজেদের যুদ্ধ। ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’। এতে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও, কেউ না কেউ খুন হচ্ছে। নিহত ব্যক্তি সরকার দলীয় হতে পারেন, বিরোধী দলের হতে পারেন, নির্দলীয় সাধারণ পথচারীও হতে পারেন। এমনকি ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা নাজমা বেগম ও তার গর্ভস্থ সন্তানের মত অন্য কেউও এর শিকার হতে পারেন।

যে কোন রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্বই হচ্ছে প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া। জানমালের নিরাপত্তা সুবিধাটুকু পাবার জন্যই মানুষ নিজের অবাধ স্বাধীনতা সীমিত করে রাষ্ট্র নামক ‘প্রয়োজনীয় আপদটি’কে তৈরি করেছে।

বিগত শতাব্দীতে বাংলাদেশের মানুষ নিজের ও ভবিষ্যত প্রজন্মের সুস্থ্য, সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের জন্য একবার নয়, দুই দুইবার নতুন রাষ্ট্র বানিয়েছে। এজন্য অন্যদের থেকে ব্যয় একটু বেশিই পড়েছে। লেগেছে ৩০ লাখ মানুষের জীবন ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম। তার পরও মাঝে মাঝে করতে হচ্ছে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর স্বপ্নে বিভোর হয়ে ২০০৮ সালে মানুষ বাক্সভরে ভোট দিয়েছিল আওয়ামী লীগকে, শেখ হাসিনাকে। কতটা কী হয়েছে, আর এজন্য কত কী খরচ হয়েছে সে হিসেবে সরকার বদল না হলে সাধারণত পাওয়া যায় না।

তবে, আপাতত সরকার বদলের কোন সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে সত্যি, কিন্তু দেশ যে নিরাপদ হয়নি সেটা বোধহয় অস্বীকার করা যাবে না। এই নিরাপত্তাহীনতার বলি হয়েছেন অনেকেই। সিলেটের শিশু রাজনের নির্মম হত্যাকাণ্ড এর বড় উদাহরণ।

আর ‘বেবি অব নাজমা বেগম’ মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ হয়ে দেখিয়ে দিল জীবন এখানে কতটাই অনিরাপদ।

মাগুরার পুলিশ এখন খুবই তৎপর গুলিবর্ষণে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদেরকে গ্রেপ্তার করতে। কিন্তু পুলিশ ছাত্রলীগের ওইসব ছেলেদেরকে গ্রেপ্তার বা বিচার করলেই কি মাতৃগর্ভে থাকা অনাগত অথবা আগত সব শিশুর জীবন নিরাপদ হয়ে যাবে? ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামক দানবগুলোকে বোতলে ঢোকাতে না পারলে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে।

আপাততঃ ‘বেবি অব নাজমা বেগম’ এর মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ হওয়ার জন্য আসলে কে দায়ী তা চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন। ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাস ও হত্যার জন্য আসলে আমরা সবাই দায়ী।

আমরা যারা ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগকে তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি আসনে বিজয়ী করে ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ তৈরি করেছি, যারা ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগকে ‘ভোটবিহীন’ নির্বাচনের মাধ্যমে আরো বহুকাল (আপাতত ২০১৯ পর্যন্ত) ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দিয়েছি তারা সবাই এজন্য দায়ী। এ আমাদের সকলের পাপ, সম্মিলিত পাপের ফসল। আর পাপ বাপকেও ছাড়ে না। আমাদেরকেও ছাড়ছে না।

তাই ‘বেবি অব নাজমা বেগম’ এর মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ হওয়ার জন্য আমরা সবাই সন্দেহভাজন। পুলিশের ভাষায়, অজ্ঞাতনামা আসামি। বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে সকলের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। সংসদ বাজেট পাস না করলেও রাষ্ট্রপতির জন্য অর্থ ব্যয় করতে রাষ্ট্র বাধ্য। রাষ্ট্রের এ ব্যয়কে বাজেটের ভাষায় ‘দায়যুক্ত’ বলা হয়। যদিও অন্যদের জন্য বাজেট বরাদ্দে সংসদের অনুমোদন নিতে হয়। তা ছাড়া রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যায় না।

তাই রাষ্ট্রপতি ছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামির মধ্যে আমরা সবাই— প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতিসহ ১৬ কোটি মানুষ সবাই আছি। কারণ আমরা কেউই পারিনি একটি অনাগত শিশুকে নিরাপদ মাতৃগর্ভ দিতে! মাতৃগর্ভে নিরাপত্তা দিতে! অজ্ঞাতনামা ১৬ কোটি এই আসামির বিরুদ্ধে দেশের নিম্ন-উচ্চ কোন আদালতে মামলা দায়ের ও অভিযোগ নামা দাখিল সম্ভব না হলেও ‘বিবেকের আদালতে’ আমরা সবাই আসামি, অভিযুক্ত!

এখানে আমরা আর অজ্ঞাত পরিচয় নই। আমাদের পরিচয় ‘বেবি অব নাজমা বেগম’ জ্ঞাত আছেন। আমরা যেখানে একটি অনাগত শিশুকে নিরাপদ মাতৃগর্ভ দিতে পারিনি, সেখানে বিশ্বকে কী করে শিশুদের বাসযোগ্য করবো?

লেখক: সাংবাদিক
ইমেইল: rayhan1957@gmail.com

মন্তব্য

মতামত দিন

অন্যান্য কলাম

adv


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com