সর্বশেষ সংবাদ: |
  • বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর প্রার্থিতা বৈধ করবে বলে জানিয়েছেন আদালত, অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত নেওয়ার পর আদেশ
  • তিন আসনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দায়ের করা রিটের শুনানি চলছে
  • সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংবিধান, ভোটার ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে দায়বদ্ধ নির্বাচন কমিশন : সিইসি

কপর্দকশূন্যতার পথে গ্রিস

পল ক্রুগম্যান ৩০ জুন,২০১৫
পল ক্রুগম্যান

কিছু ক্ষেত্রে মুদ্রা হিসেবে ইউরোর প্রচলনকে বিভ্রান্তিকর বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে একক মুদ্রা হিসেবে ইউরোর প্রচলন শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখবে—এ নিয়ে অনেকের মধ্যে দেখা গেছে সংশয়।

একটি স্থানের আর্থিক দৈন্য অন্যটিকে খুব সহজেই আক্রান্ত করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফ্লোরিডায় গৃহায়ণ সম্পর্কিত কোনো আর্থিক সমস্যা হলে তার প্রভাব পড়বে ওয়াশিংটনেও।

এদিক থেকে চিন্তা করলে একটি সম্মিলিত মুদ্রার ধারণাটাই অনেকটা আজগুবি ও ভীতিকর; যা অন্তত স্থানবিশেষে ভিন্নতার দাবি রাখে। ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক অসঙ্গতি থেকে উত্তরণে স্থানীয় বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে চাইছে, কিন্তু পরিস্থিতির দায় মেনে সফলতার মুখ দেখেনি তাদের কোনো প্রচেষ্টা।

গ্রিস এখন আর্থিক অবনমনের এমন এক ধাপে এসে উপনীত হয়েছে, মনে হচ্ছে সেখান থেকে ফিরে আসার রাস্তা খোলা নেই। সেখানকার আর্থিক দেউলিয়াত্বের মুখে অনেক ব্যাংক এখন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। পুঁজিবাজারের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বললে চলে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ মুদ্রার পরিচলন পড়েছে হুমকির মুখে। এক্ষেত্রে কর্মচারীদের বেতন দেয়া থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ঝামেলার সম্মুখীন হচ্ছে গ্রিক সরকার।

তারা প্যারালাল কারেন্সির সমস্যাগুলো এখন অন্তত হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছে। এ ধরনের নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়েও তারা নিজেদের একক মুদ্রা টিকিয়ে রাখবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় বেড়েছে।

আগামী সপ্তাহে এহেন গুরুতর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সেখানে একটি গণভোট অনুষ্ঠানের কথা জানা গেছে। এক্ষেত্রে গ্রিসের জনগণের পক্ষ থেকে যদি ‘না’ ভোট বেশি পড়ে, তবে গ্রিস সরকার তাদের একক মুদ্রা হিসেবে ইউরো থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।

তবে আমি মনে করি, গ্রিসের অর্থনীতি সম্পর্কে যে লক্ষ্মীছাড়া ভাব এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কথা লোকমুখে প্রচলিত ও জনপ্রিয়, তা সঠিক নয়। তবে এটাও ঠিক যে, ২০০০ সালের পর থেকে গ্রিসের সরকার এত বেশি খরচ করেছে, যা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে ছিল না। এতে শুধু তাদের আর্থিক দেউলিয়াত্বের সম্মুখীন হওয়ার কথা, কিন্তু তারা সব হারিয়ে এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। এক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ে চাপ দেয়ার পাশাপাশি নানা দিক থেকে ব্যয়সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে দেশটির সরকার।

সরকারি চাকরির পরিমাণ প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে, বয়স্ক ভাতা থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক নানা সুবিধা রদ করা হয়েছে বিভিন্নভাবে। এ বিষয়গুলো যদি দেশটির অর্থনীতির জন্য সুফল হয়ে আনত, তবে তাদের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির অঙ্ক এখন তুঙ্গে থাকার কথা। নানা বাস্তবতায় সেটা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু দিনের পর দিন গ্রিসের অর্থনীতির হতশ্রী দশা আরো স্পষ্ট হয়েছে।

ইউরোর ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত গ্রিস এখন আটকা পড়েছে একটি ইকোনমিক স্ট্রেইটজ্যাকেটের মধ্যে। সেখান থেকে উত্তরণে একের পর এক ব্যর্থ চেষ্টা পরিস্থিতিকে তাদের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। সময়ের দাবি মেটাতে যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল, সেগুলোয় বারবার বদল ঘটলেও সফলতার মুখ দেখেনি গ্রিস। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অবনমনের ধারাটি ক্রমে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়েছে, যা ধীরে ধীরে গ্রিসকে একটি মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে একটি বড় মানের মুদ্রার উপস্থিতি গ্রিসের অর্থনীতিকে যতটা প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে, শেষ পর্যন্ত তার সিকি ভাগও অর্জন করা যায়নি। উপরন্তু নানা দিক থেকে ধস স্পষ্ট হয়েছে।

এর সঙ্গে তুলনা করার জন্য ১৯৯০ সালের দিকে কানাডায় ঘটে যাওয়া মন্দা কিংবা এখন আইসল্যান্ডে চলমান বিপর্যয়কে উদাহরণ হিসেবে টানা যেতে পারে। কিন্তু নিজস্ব মুদ্রা না থাকায় গ্রিসের সমস্যা রূপ নিয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে।

আমি এ প্রসঙ্গেই ‘গ্রেক্সিট’ (Grexit) শব্দটির অবতারণা করতে আগ্রহী, অন্তত ইউরো থেকে গ্রিসের বের হয়ে আসাকে এ অভিধায় সংজ্ঞায়িত করা যেতেই পারে। নানা ক্ষেত্রে মন্দাভাব গ্রিসের অর্থনীতিতে যে সংকট তথা ফিন্যান্সিয়াল ক্যাওয়াজ তৈরি করেছে, সেখান থেকে উত্তরণে তারা একের পর এক নতুন পদ্ধতি প্রণয়ন করে পরীক্ষাও চালিয়েছে। শেষ পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে ব্যর্থতা তাদের হতাশ করে।

এখন গ্রিসের সরকার চাইছে কোয়ালিশন থেকে বের হয়ে আসতে। যে কোয়ালিশন তাদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে, অহেতুক সেখানে আঁকড়ে থাকা কোনো সমাধান নয়। প্রয়োজনে সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে তারা আরো অনেক কঠিন নীতিরও আশ্রয় নিতে পারে।

গ্রিক প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপরাস এর সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক কারণকেও দায়ী করতে চেয়েছেন, যা তাকে কর্মস্থল থেকে বিতাড়নের হুমকির মুখে ফেলেছিল। তাই এখন অনেক বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত ভোটাররা আগামী সপ্তাহের গণভোটে তাদের রায়ে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ কোনটিকে জয়যুক্ত করে।

তবে অনেক ব্যাংকের বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে চলমান ফিন্যান্সিয়াল ক্যাওয়াজ গ্রেক্সিটের ঘটনাকেই প্রণোদিত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিশেষে যে ‘ট্রয়কা আল্টিমেটাম’ সম্পর্কে জানা যাচ্ছে, দ্রুতই তার বাস্তবায়ন ঘটে যাওয়া বিচিত্র নয়। তবে টেকনোক্র্যাটরা সামষ্টিক অর্থনীতির পরিসর থেকে যে বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছেন, সেখানে ধারণাটি নিঃসন্দেহে ভ্রমাত্মক।

এখানে আসলে বিশ্লেষণের কিছু নেই, পুরো বিষয়টিই ক্ষমতা-সম্পর্কিত; যা প্রকৃত অর্থে গ্রিসের অর্থনীতিকে চেপে ধরেছে। তাই এখনই সময়—এর থেকে উত্তরণের। না হলে ভবিষ্যতে গ্রিস একটা বড় ধরনের অর্থনৈতিক বাধা থেকে শুরু করে মন্দার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
 
লেখক: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

মন্তব্য

মতামত দিন

অন্যান্য কলাম

adv


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com