নিধনযজ্ঞ জায়েজে ইসরাইলের বিকৃত ইতিহাসচর্চা

রবার্ট ফিস্ক ৩০ জুন,২০১৫
রবার্ট ফিস্ক

ইসরাইল গাজার শিশুদের হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করতে গেস্টাপোর ডেনিশ সদর দপ্তরে মিত্রশক্তির অভিযানের মিথ্যা সাদৃশ্য টানা আর কবে বন্ধ করবে? আরব শিশুদের মারছ কেন— বিশ্ববাসী প্রশ্ন তুললেই তারা ১৯৪৫ সালের কোপেনহেগেনের ওই বিমান হামলার নির্লজ্জ ও অসৎ ব্যাখ্যাটি দাঁড় করায়।

জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের গাজা নিধনযজ্ঞ ও সমুদ্রসৈকতে চার শিশুর প্রাণহানির তথ্যটির উল্লেখ রয়েছে। এ নিয়ে চ্যানেল ফোরের সাংবাদিক প্রশ্ন তুলতেই ইসরাইলি মুখপাত্র মার্ক রেগেভ মিথ্যা তুলনাটি দাঁড় করাতে চাইলেন।

গত বছর বিদেশি অনেক সাংবাদিকই দেখেছেন, সৈকতে জেলেদের একটি কুঁড়ের পাশে খেলার সময় ইসরাইলি হামলায় ওই শিশুরা প্রাণ হারায়। এ ব্যাপারে রেগেভের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে— এ ছিল এক মর্মস্পর্শী ভুল! এবং তিনি গেস্টাপো অভিযানের অতি প্রাচীন মিথ্যাটিকেই আউড়ে বললেন, ‘সেবারও তো আরএএফ জঙ্গিবিমানের বোমা এতিমখানায় আঘাত করেছিল; সেটিও ছিল এক মর্মস্পর্শী ঘটনা, সত্যিকারের ট্র্যাজেডি।’

নিজেদের অপরাধ পাশ কাটাতে ইসরাইল যতই ওই প্রসঙ্গ টানুক, সত্য হচ্ছে ১৯৪৫ সালের ওই ঘটনায় কোনো এতিমখানা আক্রান্ত হয়নি। বরং ইসরাইলই গত বছর গাজার সুবিন্যস্ত এলাকাগুলোয় বেপরোয়া গুলি চালিয়ে ২,২০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে, যাদের মধ্যে ১,৪৯২ জনই বেসামরিক নাগরিক।

রাজনীতিবিদরা ও তাদের প্রোপাগান্ডাকারীরা যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাটিকে ছুতো হিসেবে সামনে আনে, তাদের এ অভ্যাসটি আমি ঘৃণা করি। তাদের মিথ্যাচার ধরিয়ে দিতে ঘটনার সত্যি সংস্করণটাও উল্লেখ করতে চাই।

১৯৪৫ সালের ২১ মার্চ আরএএফ মসকুইটো বোমারু বিমানগুলো কোপেনহেগেনের গেস্টাপো সদর দপ্তরের উদ্দেশে যায় এবং এটি ছিল ডেনমার্কের বাসিন্দাদেরই অনুরোধে। কারণ দেশটির কিছু নেতাকে দপ্তরটির ছাদে জার্মানরা আটকে রেখেছিল এবং ব্রিটিশ ক্রু ও তাদের মার্কিন সহযোগীদের বলা হয়েছিল ছাদের সমান্তরালে উড়ে গিয়ে উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে। কিন্তু জার্মান হামলার শিকার হয়ে পাইলট পিটার ক্লেবোর বিমান নিয়ে দপ্তরটির ওপর আছড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিলেন। পরক্ষণেই বিমানটি পাশের সড়কে আর্ক ফ্রেঞ্চ স্কুলের গা ঘেঁষে বিধ্বস্ত হয়। এরপর উড্ডীয়মান ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখে আরেকটি আরএএফ এই জায়গাকেই হামলার লক্ষ্য মনে করে এবং কার্যত শিশুদের ওপর বোমা ঢেলে দেয়। এতে প্রাণ হারায় ৮৩টি শিশু এবং ১৩ জন বয়স্ক, যাদের বেশির ভাগই ছিলেন গির্জার সন্ন্যাসী; স্কুলটিতে তারা ক্লাস নিতেন। গেস্টাপো সদর দপ্তরও ধ্বংস করা হয় এবং ছাদে আটকে রাখা ডেনমার্কের নেতাদের কয়েকজন উদ্ধার হন।

কোপেনহেগেনে এতিমখানায় হামলা হয়নি, স্কুলও বোমার আসল লক্ষ্য ছিল না; কিন্তু ইসরাইল বেসামরিক আরব জনগণকে নিধনযজ্ঞের ছুতো হিসেবে অনেক বছর ধরে এই মিথ্যাটিকে সত্য বলে প্রমাণের চেষ্টা করছে। মিথ্যাচারটির শুরু ১৯৮২ সালে, বৈরুতে ইসরাইলের নৃশংস অবরোধকাণ্ডে বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনায় ইউরোপের দেশগুলো সমালোচনামুখর হওয়ার পর। আর কোপেনহেগেন রেইডের প্রসঙ্গটি প্রথম টেনেছিলেন তৎকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন।

১৯৮২ সালের গ্রীষ্মে বৈরুতে কয়েক হাজার বেসামরিক নাগরিক যখন প্রাণ হারায় তখন ইসরাইলি বোমারু বিমানগুলো ফিলিস্তিনি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এড়াতে এত উঁচু দিয়ে উড়ত যে লক্ষ্যস্থলও তারা ঠিক ঠাহর করতে পারত না। পক্ষান্তরে কোপেনহেগেন অভিযানে পাইলট নিচু দিয়ে উড়ছিলেন, যাতে বেসামরিক প্রাণহানি এড়ানো যায়। সত্যি বলতে কী, নিচু হয়ে গিয়ে হামলা চালালে বেসামরিক প্রাণহানি কম হয়, ইসরাইলি বিমান বৈরুত বা গাজায় কখনোই এই নীতি অনসুরণ করে না।

১৯৮২ সালেই শুধু নয়, বিগত গাজা যুদ্ধের সময়ও প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু গাজা হত্যাকাণ্ড চালানো প্রসঙ্গে কোপেনহেগেনের ওই অভিযানের কথাটি তোলেন। মার্ক রেগেভও এবার প্রথম না, গত বছরের জুনে একইভাবে চ্যানেল ফোরের প্রশ্নের জবাবে নিজেদের নিধনযজ্ঞ জায়েজ করার চেষ্টায় কোপেনহেগেন রেইডের ছুতো তোলেন।

ইসরাইল যদি কোপেনহেগেন অভিযানটির নকল করতে আগ্রহী হতো, তারা সহজেই গোলানের ইসলামপন্থী গেরিলাদের ওপর হামলা চালাতে পারত। এই গেরিলারা দ্রুজ বেসামরিক ব্যক্তিদের অপহরণ ও হত্যা করছে; দ্রুজ পরিবারগুলোর অনেকেরই বাস ইসরাইলে। এর বদলে ইসরাইল ইসলামপন্থীদের শত্রুদের ওপর আঘাত হানছে। শুধু তা-ই নয়, আহত ইসলামী গেরিলাদের তারা নিজ দেশের ভেতর চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছে।

৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিথ্যাচারটি চলছে। আমি তো মনে করি, আরো এক থেকে দুই দশক রেগেভদের মুখে এই মিথ্যাচার আমাদের শুনতে হবে।

হামবুর্গ ও ড্রেসডেনে যুদ্ধাপরাদের পর ব্রিটিশ পাইলটরা উড়ে গিয়েছিলেন এবং সম্মানের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষার্থে। শত্রু অধ্যুষিত অঞ্চলে ইসরাইলি পাইলটদের এ রকম নজির রাখতেও দেখি না।

সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট

মন্তব্য

মতামত দিন

অন্যান্য কলাম

adv


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান,
ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: +৮৮০-১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com